০২:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
পহেলা বৈশাখে ঢাবি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, শাহবাগ দুপুর ১২টা পর্যন্ত, সকাল ৯টায় বৈশাখী শোভাযাত্রা আজই ইরানের সব বন্দর অবরোধ করবে মার্কিন সামরিক বাহিনী নিষিদ্ধ পেপটাইডের মোহ: স্বাস্থ্য নাকি ঝুঁকির খেলা? শুরুতে ব্যর্থতা, তারপর ঝড়—সঞ্জু স্যামসনের জোড়া বদলে চেন্নাইয়ের নতুন আশা মার্কিন অবরোধে ইরান: ব্যর্থ আলোচনার পর নতুন সংঘাতের শঙ্কা তেল ৭ শতাংশ লাফিয়ে ১০০ ডলার ছাড়াল, ইরান অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, নভেম্বর পর্যন্ত তেল-গ্যাসের উচ্চ দাম থাকবে, হরমুজ অবরোধে বিশ্ববাজারে ৫০% বৃদ্ধি ঈদুল আজহার আগে জ্বালানি সংকটে নৌপথ অচল, পালা করে চলছে লঞ্চ-জাহাজ চট্টগ্রামে গাড়ি ৩০% কম, ভাড়া বেড়েছে ২০-৪০%—জ্বালানি সংকটে পরিবহন বিপর্যয় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় দিল্লিতে জ্বালানি সংকট, ঘরে ফেরার চিন্তায় লাখো অভিবাসী শ্রমিক

রেকর্ড রেমিটেন্সও টেনে তুলতে পারছে না অর্থনীতিকে

জাতীয়তাবাদী জোশও অর্থনীতির ধস ঠেকাতে পারছে না। এই জাতীয়তাবাদী জোশের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির পরিবর্তে বৈধপথে তাদের রোজগারের আয় পাঠাতে শুরু করেন। আর সে কারণে দেশের প্রবাসী আয় তথা রেমিটেন্সে শুধু চাঙ্গা ভাবই দেখা যাচ্ছে না, রেকর্ডের পর নতুন রেকর্ডও হচ্ছে। রেমিটেন্সে এ ধরনের রেকর্ডের পর রেকর্ড হয়েছিল কোভিডের সময় ২০২১-২০২২ সালে। তখন অবশ্য এ নিয়ে তথাকথিত সুশীল অর্থনীতিবিদরা নানা প্রশ্ন তুলেছিলেন। অবশ্য সেই ধারাবাহিকতা আর পরে অব্যাহত থাকেনি। বরং এই জাতীয়তাবাদীদের তীব্র সরকারবিরোধী মনোভাবের কারণে ২০২৪ সালে রেমিটেন্স প্রবাহে ধস নামে। এ সময় রেমিটেন্স প্রেরণকারী বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে দেশে রেমিটেন্স প্রেরণ বন্ধ করে দেয়। ফলে দেশ বৈধ রেমিটেন্স থেকে বঞ্চিত হয়। প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় রিজার্ভের ওপর। অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর রেমিটেন্স বয়কটকারী প্রবাসীদের জাতীয়তাবাদী জোশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দেশে আবার শুরু হয় বৈধপথে রেমিটেন্স আসা। যার প্রভাবে গত মার্চ মাসে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এক মাসে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশে। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।

অতীতে দেখা গেছে, এই রেমিটেন্সই অর্থনীতিকে টেনে তুলেছে। সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়েছে রপ্তানি আয়। ফলে বাড়তে বাড়তে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই রিজার্ভ আর পরবর্তীতে টিকে থাকেনি। কোভিড-পরবর্তী আমদানি বাণিজ্যের চাপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে গেলে সেই রিজার্ভের ক্ষয় শুরু হয়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় রেমিটেন্সে ধস। ফলে এক পর্যায়ে তা ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।

কিন্তু এখন রেকর্ডের পর রেকর্ড সত্ত্বেও রেমিটেন্স আর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে পারছে না। যদিও রেমিটেন্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা স্ফীত হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে এক ডলারও ছাড়া হচ্ছে না। বরং কিস্তি পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে নিচ্ছে। এতে রিজার্ভ কিছুটা স্ফীত হলেও বাজারে আমদানি বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা মার্কিন ডলারের টানাপোড়েন চলছে। দেশে এত ডলার আসার পরও টাকার মান বাড়ছে না। ফলে আমদানি ব্যয়বহুলই থাকছে। এতে বেশি দামে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে দেশের ভোক্তাদের চড়া দামে নিত্যপণ্য কিনে খেতে হচ্ছে। যার কারণে মূল্যস্ফীতি সেই উপরের স্তরেই অবস্থান করছে। এতে ভোক্তাদের দুর্ভোগ হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার চেপে ধরে বসে আছে। এমনকি ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি ডলারেরও যোগান দিতে হচ্ছে বাজারকে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রপ্তানি আয় বেড়ে ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার

আমার লেখার বিষয় অবশ্য সেটা নয়। আমার বিষয়বস্তু হচ্ছে—কী কারণে রেকর্ড রেমিটেন্সও অর্থনীতির ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে না। আর সেটি হচ্ছে, রেমিটেন্সের সহযোদ্ধা রপ্তানি আয়। যদিও দেশে রেমিটেন্সের চেয়ে দ্বিগুণ আয় হয় রপ্তানি থেকে। অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার সেদিকে নজর দেয়নি। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ওই রপ্তানি আয়েরও বারোটা বাজিয়ে গেছে। ফলে তার সময় থেকেই নীরবে ধস নেমেছে রপ্তানি আয়ে। আর ইউনূস সরকার বগল বাজিয়েছে রেমিটেন্স নিয়ে। এখন তার দায়ভার পোহাতে হচ্ছে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করা বিএনপি সরকারকে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও এরপর টানা আট মাস ধরে চলছে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। ইউনূস সরকারের সময়ই টানা ৭ মাস কমেছে রপ্তানি আয়। তারই ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসে এসে রপ্তানিতে বড় ধস দেখা গেছে। মার্চে রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।

তুলনামূলক চিত্র

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স তথা প্রবাসী আয়ের যদি একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি, তাতে দেখা যায় গত এক বছরে এই দুই খাতের সম্মিলিত চিত্রে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী প্রবণতা। প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলেও রপ্তানি আয়ের বড় পতনের কারণে দেশে আসা মোট বৈদেশিক মুদ্রা কমেছে ৫ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ মাসে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। পরের ১২ মাসে অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮.৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বাড়া, ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সুবিধা বাড়ানোর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের বড় পতনের কারণে সেই স্বস্তি পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আনতে পারছে না।

টানা ৬ মাস রেমিট্যান্স প্রেরণে শীর্ষে আরব আমিরাত

রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। প্রথম ১২ মাসে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৫৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু পরের ১২ মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ রপ্তানি আয়ে কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১৮ শতাংশের পতন।

ফলে রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানির বড় পতনের কারণে এই দুই খাত মিলিয়ে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ৮১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে প্রায় ৭৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ মোট বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এত দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক ধারায় খুব কমই দেখা গেছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এই খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ দেখা গেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গত কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন।”

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লেগেছে। এই অঞ্চলের ক্রেতারা এখন অর্ডার কম দিচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহ চেইন পুনর্বিন্যাস করছেন। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ দেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে। অবশ্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোতে। এসব বাজারে রফতানি ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ কমেছে।

তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘ লকডাউনের প্রভাব | The Business Standard

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানির তুলনায় এটি প্রায় ৭ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায়। ফলে এই অঞ্চলে রফতানি কমে যাওয়াকে খাতটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার যুক্তরাজ্য, যেখানে মোট রফতানির প্রায় ১২ শতাংশ যায়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬১ শতাংশ কম।

উত্তর আমেরিকার আরেকটি বাজার কানাডা, যেখানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রায় ৩ শতাংশ যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে রফতানি রয়েছে প্রায় স্থিতিশীল, মাত্র ০ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোতে। এসব বাজারে রফতানি ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ কমেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু সম্ভাবনা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিপণন কৌশল, বাজারভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন এবং শক্তিশালী ক্রেতা সম্পর্ক।

বিপরীত চিত্রের প্রভাব

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের বিপরীত চিত্রে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। একদিকে পণ্য রপ্তানিতে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অপরদিকে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভার বন্ধ হয়ে লেনদেন বিঘ্ন

আবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বাড়ছে। এতে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়া এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে এই ঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকার বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫.৬ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় রফতানি আয় সামান্য কমেছে।

ফলে আমদানি ও রফতানির ব্যবধান বেড়ে গিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৯১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৩.৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত গতিতে না বাড়লেও আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বেড়েছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, জ্বালানি নির্ভরতা কমানো এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায়, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সময় বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বেড়ে অর্থনীতির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

deshnews.net || দেশনিউজ.নেট | Prominent Bengali News portal

বিশ্ববাজারে ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্যও এখন উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের এই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও নতুন প্রবৃদ্ধির পথ খুঁজে পেতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বাজার বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কৌশলগত রফতানি পরিকল্পনা।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাদের সোর্সিং কৌশল নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। ফলে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার করা। পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করা। প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত কিছু নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।

রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য বড় অঙ্কের ডলার প্রয়োজন হওয়ায় এই পরিস্থিতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এখন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় রপ্তানি আয়ের এই নিম্নমুখী ধারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

জনপ্রিয় সংবাদ

পহেলা বৈশাখে ঢাবি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, শাহবাগ দুপুর ১২টা পর্যন্ত, সকাল ৯টায় বৈশাখী শোভাযাত্রা

রেকর্ড রেমিটেন্সও টেনে তুলতে পারছে না অর্থনীতিকে

১১:৩৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জাতীয়তাবাদী জোশও অর্থনীতির ধস ঠেকাতে পারছে না। এই জাতীয়তাবাদী জোশের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির পরিবর্তে বৈধপথে তাদের রোজগারের আয় পাঠাতে শুরু করেন। আর সে কারণে দেশের প্রবাসী আয় তথা রেমিটেন্সে শুধু চাঙ্গা ভাবই দেখা যাচ্ছে না, রেকর্ডের পর নতুন রেকর্ডও হচ্ছে। রেমিটেন্সে এ ধরনের রেকর্ডের পর রেকর্ড হয়েছিল কোভিডের সময় ২০২১-২০২২ সালে। তখন অবশ্য এ নিয়ে তথাকথিত সুশীল অর্থনীতিবিদরা নানা প্রশ্ন তুলেছিলেন। অবশ্য সেই ধারাবাহিকতা আর পরে অব্যাহত থাকেনি। বরং এই জাতীয়তাবাদীদের তীব্র সরকারবিরোধী মনোভাবের কারণে ২০২৪ সালে রেমিটেন্স প্রবাহে ধস নামে। এ সময় রেমিটেন্স প্রেরণকারী বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে দেশে রেমিটেন্স প্রেরণ বন্ধ করে দেয়। ফলে দেশ বৈধ রেমিটেন্স থেকে বঞ্চিত হয়। প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় রিজার্ভের ওপর। অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর রেমিটেন্স বয়কটকারী প্রবাসীদের জাতীয়তাবাদী জোশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দেশে আবার শুরু হয় বৈধপথে রেমিটেন্স আসা। যার প্রভাবে গত মার্চ মাসে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এক মাসে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশে। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।

অতীতে দেখা গেছে, এই রেমিটেন্সই অর্থনীতিকে টেনে তুলেছে। সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়েছে রপ্তানি আয়। ফলে বাড়তে বাড়তে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই রিজার্ভ আর পরবর্তীতে টিকে থাকেনি। কোভিড-পরবর্তী আমদানি বাণিজ্যের চাপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে গেলে সেই রিজার্ভের ক্ষয় শুরু হয়। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় রেমিটেন্সে ধস। ফলে এক পর্যায়ে তা ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।

কিন্তু এখন রেকর্ডের পর রেকর্ড সত্ত্বেও রেমিটেন্স আর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে পারছে না। যদিও রেমিটেন্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা স্ফীত হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে এক ডলারও ছাড়া হচ্ছে না। বরং কিস্তি পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে নিচ্ছে। এতে রিজার্ভ কিছুটা স্ফীত হলেও বাজারে আমদানি বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা মার্কিন ডলারের টানাপোড়েন চলছে। দেশে এত ডলার আসার পরও টাকার মান বাড়ছে না। ফলে আমদানি ব্যয়বহুলই থাকছে। এতে বেশি দামে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করতে গিয়ে দেশের ভোক্তাদের চড়া দামে নিত্যপণ্য কিনে খেতে হচ্ছে। যার কারণে মূল্যস্ফীতি সেই উপরের স্তরেই অবস্থান করছে। এতে ভোক্তাদের দুর্ভোগ হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার চেপে ধরে বসে আছে। এমনকি ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি ডলারেরও যোগান দিতে হচ্ছে বাজারকে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রপ্তানি আয় বেড়ে ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার

আমার লেখার বিষয় অবশ্য সেটা নয়। আমার বিষয়বস্তু হচ্ছে—কী কারণে রেকর্ড রেমিটেন্সও অর্থনীতির ওপর কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে না। আর সেটি হচ্ছে, রেমিটেন্সের সহযোদ্ধা রপ্তানি আয়। যদিও দেশে রেমিটেন্সের চেয়ে দ্বিগুণ আয় হয় রপ্তানি থেকে। অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার সেদিকে নজর দেয়নি। বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ওই রপ্তানি আয়েরও বারোটা বাজিয়ে গেছে। ফলে তার সময় থেকেই নীরবে ধস নেমেছে রপ্তানি আয়ে। আর ইউনূস সরকার বগল বাজিয়েছে রেমিটেন্স নিয়ে। এখন তার দায়ভার পোহাতে হচ্ছে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করা বিএনপি সরকারকে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও এরপর টানা আট মাস ধরে চলছে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। ইউনূস সরকারের সময়ই টানা ৭ মাস কমেছে রপ্তানি আয়। তারই ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসে এসে রপ্তানিতে বড় ধস দেখা গেছে। মার্চে রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।

তুলনামূলক চিত্র

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স তথা প্রবাসী আয়ের যদি একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি, তাতে দেখা যায় গত এক বছরে এই দুই খাতের সম্মিলিত চিত্রে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী প্রবণতা। প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলেও রপ্তানি আয়ের বড় পতনের কারণে দেশে আসা মোট বৈদেশিক মুদ্রা কমেছে ৫ বিলিয়ন ডলার।

২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১২ মাসে দেশে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। পরের ১২ মাসে অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৮.৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বাড়া, ডলারের বিনিময় হার সমন্বয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সুবিধা বাড়ানোর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের বড় পতনের কারণে সেই স্বস্তি পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আনতে পারছে না।

টানা ৬ মাস রেমিট্যান্স প্রেরণে শীর্ষে আরব আমিরাত

রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। প্রথম ১২ মাসে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৫৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু পরের ১২ মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ রপ্তানি আয়ে কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১৮ শতাংশের পতন।

ফলে রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানির বড় পতনের কারণে এই দুই খাত মিলিয়ে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ৮১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে প্রায় ৭৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ মোট বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এত দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক ধারায় খুব কমই দেখা গেছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু এই খাতেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ দেখা গেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গত কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেক ক্রেতা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন।”

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লেগেছে। এই অঞ্চলের ক্রেতারা এখন অর্ডার কম দিচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহ চেইন পুনর্বিন্যাস করছেন। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ দেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে। অবশ্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোতে। এসব বাজারে রফতানি ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ কমেছে।

তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘ লকডাউনের প্রভাব | The Business Standard

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানির তুলনায় এটি প্রায় ৭ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায়। ফলে এই অঞ্চলে রফতানি কমে যাওয়াকে খাতটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম।

বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার যুক্তরাজ্য, যেখানে মোট রফতানির প্রায় ১২ শতাংশ যায়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশটিতে রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬১ শতাংশ কম।

উত্তর আমেরিকার আরেকটি বাজার কানাডা, যেখানে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রায় ৩ শতাংশ যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে রফতানি রয়েছে প্রায় স্থিতিশীল, মাত্র ০ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোতে। এসব বাজারে রফতানি ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ কমেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু সম্ভাবনা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিপণন কৌশল, বাজারভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন এবং শক্তিশালী ক্রেতা সম্পর্ক।

বিপরীত চিত্রের প্রভাব

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎসের বিপরীত চিত্রে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। একদিকে পণ্য রপ্তানিতে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অপরদিকে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভার বন্ধ হয়ে লেনদেন বিঘ্ন

আবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বাড়ছে। এতে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়া এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে এই ঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকার বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ছিল ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫.৬ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় রফতানি আয় সামান্য কমেছে।

ফলে আমদানি ও রফতানির ব্যবধান বেড়ে গিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৯১ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৩.৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত গতিতে না বাড়লেও আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বেড়েছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, জ্বালানি নির্ভরতা কমানো এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায়, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার সময় বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বেড়ে অর্থনীতির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

deshnews.net || দেশনিউজ.নেট | Prominent Bengali News portal

বিশ্ববাজারে ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্কসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্যও এখন উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের এই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও নতুন প্রবৃদ্ধির পথ খুঁজে পেতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বাজার বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কৌশলগত রফতানি পরিকল্পনা।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা তাদের সোর্সিং কৌশল নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। ফলে সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার করা। পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করা। প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে রপ্তানি খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দ্রুত কিছু নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।

রেমিট্যান্স বাড়লেও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য বড় অঙ্কের ডলার প্রয়োজন হওয়ায় এই পরিস্থিতি অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এখন অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় রপ্তানি আয়ের এই নিম্নমুখী ধারা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক