মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শহরের অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনে। কাজের খোঁজে দূরদূরান্ত থেকে আসা এই শ্রমিকরা এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এবং অনেকেই স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সংকটে জ্বালানি, বেড়েছে খরচ
দিল্লির বিভিন্ন বস্তি ও অস্থায়ী বসতিতে থাকা শ্রমিকদের প্রধান ভরসা রান্নার গ্যাস। কিন্তু সংকটের কারণে কালোবাজারে গ্যাসের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে প্রতি কেজি গ্যাস ৮০ থেকে ৯০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা বেড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করা একজন শ্রমিকের পক্ষে এই খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুলায় আগুন, কিন্তু জীবনে অন্ধকার
গ্যাসের অভাবে অনেক শ্রমিকই এখন কাঠ বা নির্মাণস্থলের ফেলে দেওয়া কাঠের টুকরো জ্বালিয়ে রান্না করছেন। ভোরবেলা ধোঁয়ায় ভরা পরিবেশে রুটি বানাতে দেখা যায় অনেককে। তবে এই বিকল্পও এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির সময় রান্না করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে নতুন সংকট তৈরি করছে।
বিদ্যুৎও সমাধান নয়
অনেকেই বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারের কথা ভাবলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। ঘিঞ্জি বাসায় সীমিত বিদ্যুৎ সংযোগ থাকায় ইন্ডাকশন বা হিটার চালালে লাইন পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে এই পথও বন্ধ হয়ে গেছে শ্রমিকদের জন্য।
আয়ের অনিশ্চয়তা, সঞ্চয় প্রায় শূন্য
অভিবাসী শ্রমিকদের আয়ের উৎস অনিয়মিত, আর সঞ্চয় খুবই সীমিত। ফলে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকট তাদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা কেবল টিকে থাকার জন্যই কাজ করছেন, সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ নেই।
গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত
এই সংকটের মধ্যে অনেক শ্রমিক ইতিমধ্যেই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। যারা এখনো আছেন, তারাও সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের মতে, গ্রামে কাজের নিশ্চয়তা না থাকলেও খরচ কম এবং পরিবার একসঙ্গে থাকায় জীবন কিছুটা সহজ।
বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন
একজন শ্রমিকের কথায়, কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে দিনে তিনবেলা খাবার দরকার। কিন্তু যদি আয়ের প্রায় পুরোটাই খাবারে খরচ হয়ে যায়, তাহলে শহরে থাকার অর্থ কী? তাই অনেকেই মনে করছেন, পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়াই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
নারীদের বাড়তি দুর্ভোগ
দিল্লির একটি বস্তিতে বসবাসকারী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক নারী প্রতিদিন আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে কাঠ সংগ্রহ করে রান্না করছেন। ছয় সন্তানের পরিবার নিয়ে তার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, যতদিন কাঠ পাওয়া যাবে ততদিন কোনোভাবে চলবে, এরপর গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















