ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই—তাঁর প্রস্থানেই যেন থমকে গেল এক যুগের সুর। ৯২ বছর বয়সে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হওয়ার পর সোমবার মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। এই দিনে মহারাষ্ট্রজুড়ে সরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়, যা তাঁর অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে ওঠে।
শ্রদ্ধায় ভরা শেষযাত্রা
মুম্বইয়ের লোয়ার পারেলের বাসভবন থেকে ফুলে সাজানো মরদেহ নিয়ে শোকযাত্রা শুরু হয়। কাচের কফিনে রাখা তাঁর দেহ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল। সকাল থেকেই ভক্ত, সহকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ভিড় করেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। শহরের রাস্তাজুড়ে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে শোকযাত্রা এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে।
সেখানে প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর অমর গানের সুর। “আশা তাই অমর রহে”—এই স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ, যা প্রমাণ করে মানুষের হৃদয়ে তাঁর অমলিন অবস্থান।
রাষ্ট্রীয় সম্মান ও নিরাপত্তা
শেষকৃত্যের আগে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। শিবাজি পার্কে কয়েকশো মিটারজুড়ে জনসমাগমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
রাজ্য সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, ভারতীয় সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আয়োজন করা হয়েছে।
সুরের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা
অনুষ্ঠানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সংগীতশিল্পীরা তাঁর স্মরণে গান পরিবেশন করেন, যা উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে। প্রায় আট দশকের ক্যারিয়ারে তিনি হাজার হাজার গান গেয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পরিবারের কান্নাভেজা বিদায়
পারিবারিক সদস্যদের জন্য এটি ছিল এক অসহনীয় মুহূর্ত। তাঁর ছেলে আনন্দ ভোঁসলে শেষকৃত্যের আগুন জ্বালান। নাতনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ছিলেন গভীর শোকে নিমজ্জিত।
জীবনের শেষ অধ্যায়
এক সপ্তাহ আগে তাঁকে মুম্বইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তায় রাখা হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হলে রবিবার সন্ধ্যায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভক্তরা বাসভবনের সামনে ভিড় জমান।
শেষ পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন তিনি
বয়সের ভার সত্ত্বেও সংগীত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পুনেতে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হুইলচেয়ারে বসেই গান পরিবেশন করেছিলেন। ২০২৬ সালের শুরুতে একটি আঞ্চলিক ছবির জন্য তাঁর শেষ রেকর্ডিং প্রকাশ পায়।
এক অনন্য উত্তরাধিকার
সংগীত পরিচালক, গীতিকার ও শিল্পীরা স্মরণ করেছেন তাঁর অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভাকে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে আধুনিক সব ধারাতেই সমান দক্ষতায় গান গেয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য কণ্ঠস্বর। তাঁর বড় বোন, আরেক কিংবদন্তি শিল্পী, ২০২২ সালে প্রয়াত হন।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গান আর স্মৃতি বেঁচে থাকবে অগণিত মানুষের হৃদয়ে—চিরকাল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















