২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে যারা গভীর রাত পর্যন্ত আমেরিকার রিয়েলিটি টেলিভিশন দেখেছেন, তারা রাজনীতিতে আসার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিনতেন। তাঁর অনুষ্ঠান ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ তাঁকে এক আদর্শ আমেরিকান করপোরেট প্রধান হিসেবে তুলে ধরেছিল—কঠোর, স্পষ্টভাষী, কিন্তু সিদ্ধান্তে অটল ও বিচক্ষণ। জটিল বিষয়গুলোকে তিনি সহজ সিদ্ধান্তে নামিয়ে আনতেন। আর নির্দ্বিধায় কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে বলতেন—“তুমি বরখাস্ত!”—যা ছিল সেই অনুষ্ঠানের পরিচিত সংলাপ।
এই সাজানো ভাবমূর্তি ছিল তাঁর সমর্থকদের ভাষায় ‘ডিপ স্টেট’-এর বিপরীত—একটি অদৃশ্য ও জটিল রাষ্ট্রযন্ত্র, যেখানে সিদ্ধান্ত হয় কিন্তু দায় নির্ধারণ করা কঠিন। ট্রাম্পকে দেখানো হয়েছিল এমন এক নেতা হিসেবে, যিনি সবার কথা শুনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন এবং তার দায় নিজের কাঁধে নেন।
এই ধরনের নেতৃত্বের চাহিদা তৈরি হয় তখনই, যখন সরকার এতটাই দূরবর্তী ও যান্ত্রিক হয়ে পড়ে যে সাধারণ মানুষ মনে করে, তাদের কথা আর শোনা হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি থেকেই জন্ম নেয় কর্তৃত্ববাদী জনপ্রিয়তা—যেখানে মানুষ নিয়ম ভেঙে দৃঢ় নেতৃত্ব চায়। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প সেই চাহিদার প্রতিফলন, যেমন ফিলিপাইনে ছিলেন রদ্রিগো দুতের্তে।

এই নেতৃত্বের ধরন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনায়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমাদের এটা করতে হবে”—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানো। মাত্র দুই দিন পরই সেই হামলা শুরু হয়।
এই সিদ্ধান্তের পেছনের ঘটনা উঠে এসেছে একটি বিশদ প্রতিবেদনে, যা ৭ এপ্রিল প্রকাশ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদক জনাথন সোয়ান ও ম্যাগি হ্যাবারম্যান হোয়াইট হাউসে উপস্থিত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তথ্য তুলে ধরেন।
সিদ্ধান্তটি আসে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ধারাবাহিক বৈঠকের পর। শুরুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরাসরি উপস্থিত হয়ে ব্রিফিং দেন। এরপর ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা প্রধান ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

ইসরায়েলের পরিকল্পনায় চারটি লক্ষ্য ছিল—ইরানের শীর্ষ নেতাদের একযোগে হত্যা, তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, জনগণের বিদ্রোহ উসকে দেওয়া এবং ইসলামী শাসনের জায়গায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
সব শুনে ট্রাম্প বলেন, “ভালো শোনাচ্ছে।” বৈঠক শেষে নেতানিয়াহু আত্মবিশ্বাস নিয়ে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেন।
পরদিন ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব টিম নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সচিব, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান, সিআইএ পরিচালক, চিফ অব স্টাফ এবং ইরান সংলাপের জন্য নিযুক্ত ব্যক্তিগত দূতরা।
সিআইএ পরিচালক ইসরায়েলের পরিকল্পনাকে ‘অবাস্তব’ বলে উল্লেখ করেন এবং সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে সতর্ক করেন। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েল বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করছে, হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে এবং বড় ধরনের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারকে বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দেবে।
প্রতিরক্ষা সচিব ছাড়া টেবিলে উপস্থিত প্রায় সবাই এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি সবচেয়ে বেশি আপত্তি তুলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত বলেন—এটি প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত, এবং তারা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সেই ভিন্নমত কোনো প্রভাবই ফেলেনি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই আলোচনায় যা একেবারেই অনুপস্থিত ছিল, তা হলো আইনি, নৈতিক এবং মানবিক পরিণতি নিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের পুরো সরকারকে একযোগে হত্যার নির্দেশ দেওয়া—এবং এর ফলে কোটি মানুষের জীবনে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে—তা নিয়ে কোনো গভীর চিন্তা দেখা যায়নি।
একজন প্রেসিডেন্ট, চারপাশে অনুগত একটি দল নিয়ে, নিজের অনুভূতির ভিত্তিতে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন—যার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
যুদ্ধ কোনো টেলিভিশন অনুষ্ঠান নয়, যেটি সম্পাদনা করে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়। এখানে হাজারো নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়, সম্পূর্ণ সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যায়। আর আজকের এই সংযুক্ত বিশ্বে, এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—তাদের জীবনেও, যারা সেই সিদ্ধান্তের অংশ ছিল না।
হরমুজ প্রণালী কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়। আন্তর্জাতিক আইনও কোনো একটি রাষ্ট্রের একচেটিয়া নয়। ফেব্রুয়ারির পর থেকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জ্বালানির দাম ও সার সংকট যেভাবে বেড়েছে, তার বোঝা বহন করছে সাধারণ মানুষ—যাদের মতামত কখনো নেওয়া হয়নি।

এটাই ঘটে, যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এক ব্যক্তির প্রবৃত্তির ওপর ছেড়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র তার নেতাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। আর বিশ্বকেও সেই সত্য উচ্চারণ করার সাহস দেখাতে হবে।
র্যান্ডি ডেভিড 



















