দীর্ঘ পতনের পর আবারও কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পখাত। ডিসেম্বরের ধস কাটিয়ে জানুয়ারিতে উৎপাদন সূচকে প্রবৃদ্ধি ফিরে আসায় শিল্পখাতে স্বস্তির আভাস মিলেছে, তবে সামগ্রিক চিত্র এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
শিল্প উৎপাদনে আংশিক পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বড় শিল্পখাতের উৎপাদন সূচক বছরওয়ারি প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে ডিসেম্বরে এই সূচক ৬.৩৪ শতাংশ কমে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল। ফলে নতুন এই প্রবৃদ্ধিকে অনেকেই প্রাথমিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশই আসে এই বৃহৎ শিল্পখাত থেকে, ফলে এর পরিবর্তন সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
নির্বাচন প্রত্যাশায় ব্যবসায় আস্থা
শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের আস্থাকে কিছুটা শক্তিশালী করেছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ও বিনিয়োগের মনোভাব ইতিবাচক হয়েছে, যা জানুয়ারির প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

পোশাক খাতের চাপই বড় বাধা
তবে শিল্পখাতের সবচেয়ে বড় অংশ, তৈরি পোশাক শিল্প, এখনো নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মোট উৎপাদন সূচকের প্রায় ৬১ শতাংশ ওজন বহন করা এই খাত জানুয়ারিতে ৩.৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক চাহিদার ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে এই খাতে। ফলে পুরো শিল্পখাতের ওপর এর প্রভাবও বেশি পড়ছে।
টেক্সটাইলসহ কিছু খাতে উত্থান
পোশাক খাতের দুর্বলতার বিপরীতে টেক্সটাইল খাত কিছুটা শক্তি দেখিয়েছে। প্রায় ১১ শতাংশ ওজনের এই খাত জানুয়ারিতে ৫.২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা সামগ্রিক সূচককে ইতিবাচক রাখতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি পানীয়, তামাক, কাগজ ও মুদ্রণ এবং ওষুধ শিল্পেও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
অন্যদিকে খাদ্যপণ্য, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও মোটরযান খাতে সংকোচন দেখা গেছে, যা শিল্প পুনরুদ্ধারকে সীমিত করেছে।
রপ্তানি ও ব্যয়ের চাপ বাড়ছে
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে উৎপাদকরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি। ক্রেতারা বাড়তি খরচ কমাতে সরবরাহকারীদের ওপর মূল্য কমানোর চাপ দিচ্ছেন, ফলে মুনাফা সংকুচিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি বড় ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক—দুই ধরনের ঝুঁকিই এখনো উচ্চমাত্রায় রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব শুধু শিল্প নয়, কৃষিসহ সব বাস্তব খাতেই পড়ছে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার প্রভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। ফলে শিল্পখাতের সামনে চ্যালেঞ্জ এখনো বহাল রয়েছে।
পুনরুদ্ধার না সাময়িক স্বস্তি?
জানুয়ারির প্রবৃদ্ধি শিল্পখাতে স্বস্তির বার্তা দিলেও এটি টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের দুর্বলতা, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে সামনে পথ এখনো কঠিন। তাই এই পুনরুদ্ধারকে স্থায়ী করতে হলে নীতি সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















