বিশ্বজুড়ে সার সরবরাহ সংকটের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার ইউরিয়া এখন বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, আর এই পরিস্থিতিতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়াসহ একাধিক দেশ ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঝুঁকছে।
সংকটের উৎস: হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত
ইন্দোনেশিয়ার উপ-কৃষিমন্ত্রী সুদারিওনো জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ভারত, ফিলিপাইন, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া ইউরিয়া আমদানির জন্য জাকার্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ৩৪ কিলোমিটার, যেখানে উত্তরে ইরান ও দক্ষিণে ওমান অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরান অধিকাংশ জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। ফলে ইউরিয়ার দাম দ্রুত বেড়ে টনপ্রতি প্রায় ৬০০-৭০০ ডলার থেকে ৯০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

ইন্দোনেশিয়ার বাড়তি উৎপাদন: সুযোগ ও সম্ভাবনা
এই অস্থির বাজারে ইন্দোনেশিয়া তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটির ইউরিয়া উৎপাদন মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, যা অভ্যন্তরীণভাবে নিশ্চিত হওয়ায় সরবরাহে স্থিতিশীলতা রয়েছে।
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৪.৫ মিলিয়ন টন, যা দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। সরকার ২০২৬ সালে প্রায় ১৫ লাখ টন উদ্বৃত্ত উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা রপ্তানির জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।
সুদারিওনো জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ইতোমধ্যে এই অতিরিক্ত ইউরিয়া সংগ্রহের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
রপ্তানিতে সতর্কতা: খাদ্য নিরাপত্তা অগ্রাধিকার
তবে সরকার রপ্তানি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে বা উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে যাতে দেশের কৃষি খাতে সমস্যা না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে সম্ভাব্য এল নিনোজনিত খরার মতো জলবায়ু ঝুঁকি মাথায় রেখে খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
নীতিতে পরিবর্তন: বন্ধ হচ্ছে না কারখানা
বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ার কারণে ইন্দোনেশিয়া আগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। আগে কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ করার পরিকল্পনা থাকলেও এখন তা বাতিল করা হয়েছে।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দেশটি নতুন রপ্তানি সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।

অস্ট্রেলিয়ার সংকট: মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি
অস্ট্রেলিয়া সাধারণত তাদের ইউরিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ২০২৫ সালে তাদের মোট আমদানির প্রায় ৬৫ শতাংশই এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার থেকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে গেছে। এপ্রিল মাসে ওই অঞ্চল থেকে মাত্র একটি জাহাজ পৌঁছেছে, আর বাকি চালান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সরানো হয়েছে, যার মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনেই উল্লেখযোগ্য।
ভারতের চাপ: বড় টেন্ডার আহ্বান
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া আমদানিকারক ভারতও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। গ্যাসের সীমিত সরবরাহ ও চালান বিলম্বের কারণে দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত সম্প্রতি ২৫ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছে, যা তাদের বার্ষিক আমদানি চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
টেন্ডারে সর্বনিম্ন দর ছিল টনপ্রতি প্রায় ৯৩৫ থেকে ৯৫৯ ডলার, যা বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকেই প্রতিফলিত করে।
সার্বিক চিত্র
হরমুজ প্রণালী ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক সার বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইন্দোনেশিয়ার উদ্বৃত্ত উৎপাদন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই দেশটির প্রধান লক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















