হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধের প্রথম ২৪ ঘণ্টা নিয়ে বিভ্রান্তি এখনো কাটেনি। প্রেসিডেন্টের ঘোষণা এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের নির্দেশনার মধ্যে পার্থক্য থাকায় অভিযানের প্রকৃত সীমা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রথম ২৪ ঘণ্টাকে সফল বলে দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছয়টি জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কোনো জাহাজই অবরোধ ভেঙে এগোতে পারেনি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১০ হাজারের বেশি নাবিক, মেরিন ও বিমানবাহিনীর সদস্য, এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং বহু বিমান এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে। তারা ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোকে আটকে দেওয়ার মিশন পরিচালনা করছে।

তবে এই ছয়টি জাহাজের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে অবরোধ কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুটি ইরান-সংযুক্ত জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে সক্ষম হয়, যদিও পরে তাদের আর অগ্রসর হতে দেখা যায়নি।
প্রথম জাহাজটি ‘এলপিস’, কমোরোস পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার। এটি মার্চের শেষ দিকে ইরানের বুশেহর বন্দর থেকে মিথানল নিয়ে যাত্রা শুরু করে এবং গত দুই সপ্তাহ ধরে উপসাগরে অবস্থান করছিল। অবরোধ শুরু হওয়ার পর এটি আরব সাগরে গিয়ে প্রায় স্থির হয়ে পড়ে।
শুরুতে স্পষ্ট ছিল না, অবরোধ শুরুর আগে ইরানের বন্দর ছেড়ে আসা জাহাজগুলো এর আওতায় পড়বে কি না। তবে জাহাজ অনুসরণকারী তথ্য অনুযায়ী, এলপিস প্রণালীর বাইরে গিয়ে কার্যত থেমে যায়।
এই ট্যাংকারটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং অভিযোগ রয়েছে, এটি ইরানের তেল চীনে পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ইরান ও চীন সাধারণত ‘গ্রে ফ্লিট’ নামে পরিচিত জাহাজ ব্যবহার করে তেল বাণিজ্য চালায়, যেখানে সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হয় এবং ট্র্যাকিং যন্ত্র বন্ধ রাখা হয়, যাতে নজরদারি এড়ানো যায়।

দ্বিতীয় ট্যাংকারটি ‘রিচ স্টারি’, মালাউইয়ের পতাকাবাহী হলেও চীনের মালিকানাধীন। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে মিথানল নিয়ে ওমানের সোহার বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। অতীতে এই জাহাজটি তার পণ্যের আসল উৎস গোপন করতে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করেছে বলে সন্দেহ রয়েছে।
রবিবার ট্রাম্প অবরোধ ঘোষণা করার পর এটি প্রথমবার উপসাগর ছাড়ার চেষ্টা বাতিল করে। তবে অবরোধ কার্যকর হওয়ার সময় সোমবার আবার যাত্রা শুরু করে, কিন্তু মঙ্গলবার আরব সাগর থেকে ফিরে উপসাগরের দিকে ঘুরে যেতে দেখা যায়।
চীনের মালিকানাধীন হওয়ায়, এ জাহাজে ওঠার যে কোনো চেষ্টা বড় ধরনের উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।
তৃতীয় একটি জাহাজ ‘ক্রিস্টিয়ানা’, যা অবরোধের আগে বুশেহর থেকে পণ্য নিয়েছিল, সোমবার প্রণালী অতিক্রম করার পর মঙ্গলবার বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের দিকে যেতে দেখা গেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এই অবরোধকে “ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন” বলে নিন্দা জানিয়েছে। তবে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে আগ্রহী নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
অবরোধ নিয়ে বিভ্রান্তির একটি বড় কারণ হলো ট্রাম্পের প্রাথমিক ঘোষণার সঙ্গে সেন্ট্রাল কমান্ডের নির্দেশনার পার্থক্য। রবিবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হতে চাওয়া সব জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করবে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে যেসব জাহাজ ইরানকে ট্রানজিট ফি দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অবরোধ প্রযোজ্য হবে। “যে কেউ অবৈধ টোল দেবে, সে আর নিরাপদে সমুদ্রপথে চলাচল করতে পারবে না,” তিনি সতর্ক করেন।
কিন্তু সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, এই অবরোধ কেবল ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকার সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং ট্রাম্প যে টোলের কথা বলেছেন, তা নিয়ে কোনো উল্লেখ করেনি।

মঙ্গলবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কতটা কঠোরভাবে এই অবরোধ বাস্তবায়ন করবে, বিশেষ করে জাহাজে ওঠার মতো পদক্ষেপ নেবে কি না—তা স্পষ্ট হয়নি। এই পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য হলো ইরানের তেল আয়ের উৎস বন্ধ করা এবং তেহরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা, কারণ সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় দুই পক্ষ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
বর্তমানে দুই পক্ষ একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে, যা ২১ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। তবে এর মধ্যেও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং ইসরায়েল লেবাননে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাইমন জোন্স জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোন জাহাজগুলোকে থামাবে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, নির্দেশ অমান্যকারী জাহাজে ওঠার জন্য দ্রুতগতির নৌকা বা হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হতে পারে।

মঙ্গলবার আরও কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করেছে, তবে সেগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান বা ইরাকের বন্দরগামী বা সেখান থেকে আসা হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল।
এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুক্রবার প্যারিসে একটি বৈঠকের সহ-সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে এমন দেশগুলোকে একত্র করা হবে, যারা যুদ্ধের পক্ষ না হয়েও পরিস্থিতি অনুকূলে এলে হরমুজ প্রণালীতে একটি মিশনে অংশ নিতে আগ্রহী।

ম্যাক্রোঁর দপ্তর জানিয়েছে, ইউরোপ ও অন্যান্য অংশীদাররা একটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক মিশনে অংশ নিতে প্রস্তুত, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যুদ্ধ-পরবর্তী একটি অভিযান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যাতে তেলবাহী জাহাজ ও কনটেইনার জাহাজগুলোকে নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করতে সহায়তা করা যায়।
লারিসা ব্রাউন, রিচার্ড স্পেন্সার 



















