আফ্রিকার এক দূরবর্তী সাফারি ক্যাম্পে নারীরা শুধু বিপন্ন বন্যপ্রাণ রক্ষা করছেন না, বরং পরিবারকে টিকিয়ে রাখা এবং সমাজে নারীর ভূমিকা বদলে দেওয়ার নীরব লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছেন।
এক নামের ভেতর লুকানো গল্প
মিস পি খাকি পোশাকে বসে ছিলেন সিতাতুঙ্গা গ্রেট প্লেইন্স প্রাইভেট আইল্যান্ড ক্যাম্পে। সামনে সাজানো খাবার, কিন্তু তিনি খাচ্ছিলেন সাবধানে—যেন প্রাচুর্যও অনুমতি চায়। নিজের নামের অর্থ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এর মানে কষ্ট আর প্রত্যাখ্যান। আমার জন্মের আগেই বাবা মা’কে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।”
তিনি নিজের মেয়ের কাছে এই নামের অর্থ পৌঁছে দিতে চান না। ছয় বছরের মেয়েকে তিনি একাই বড় করছেন—যেমনটা করেছিলেন তাঁর মা।
প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর সংগ্রামের ভূমি
সিতাতুঙ্গা প্রাইভেট আইল্যান্ড অবস্থিত ওকাভাঙ্গো ডেল্টায়, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ ডেল্টা হিসেবে পরিচিত। জীববৈচিত্র্য ও প্রাচীন সংস্কৃতির জন্য এটি বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা।
মিস পি বামবুকুশু জনগোষ্ঠীর মানুষ। একসময় তাঁদের পূর্বপুরুষদের বৃষ্টির নিয়ন্ত্রক মনে করা হতো। কিন্তু আজ আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। কাজের সুযোগ সীমিত, আর নারীদের জন্য তা আরও কম। শিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য তাদের অর্থনীতির বাইরে রেখেছে।

বন্যপ্রাণের বিলুপ্তি ও নতুন উদ্যোগ
একসময় বিশ্বে গণ্ডারের সংখ্যা ছিল কয়েক লাখ। শতাব্দীর শেষে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র কয়েক হাজারে। বতসোয়ানায় শেষ গণ্ডারটি মারা যায় ১৯৮৫ সালে।
এই প্রেক্ষাপটে গ্রেট প্লেইন্স ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করে। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা টেকসই বন্যপ্রাণ পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এর অন্যতম উদ্যোগ ‘নারী রেঞ্জার কর্মসূচি’।
একজন নারী রেঞ্জারের আয়ে প্রায় দশজনের পরিবার চলে। পাশাপাশি নারীরা মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণের সংঘাত কমাতে বেশি দক্ষ বলে প্রমাণিত হয়েছেন।
সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া প্রশিক্ষণ
২০২২ সালে ২৪টি নারী রেঞ্জার পদের জন্য একদিনেই ২০০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে। নির্বাচিতদের ছয় মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এই প্রশিক্ষণে ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞান, নৌচালনা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও আলোকচিত্রের মতো দক্ষতা শেখানো হয়।
মিস পি বলেন, “এই চাকরিতে থাকার জায়গা ও খাবার থাকে, তাই আমার আয় প্রায় পুরোটা পরিবারে দিতে পারি। এতে আমার মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারছি।”
প্রতিদিনের কাজ ও দায়িত্ব
এখন মিস পি ও তাঁর সহকর্মীরা বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার কাজ করেন।
তারা পুনর্বাসিত গণ্ডারদের প্রতিদিন খুঁজে বের করে গুনে দেখেন। মা হিসেবে তিনি গণ্ডারের আচরণও ভালো বোঝেন, বিশেষ করে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের সময়।

চ্যালেঞ্জের মুখে সাহস
এই কাজ সহজ নয়। অনেক সময় খোলা জঙ্গলে থাকতে হয়, যেখানে মৌলিক সুবিধাও নেই। তবুও তারা পুরুষ সহকর্মীদের সামনে দুর্বলতা দেখান না।
একবার নৌকা টহলের সময় চালক অজ্ঞান হয়ে পড়লে মিস পিই নৌকা চালান। হিপোর আক্রমণে নৌকা ডুবে যেতে বসলে তিনি প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে তিনজনের জীবন বাঁচান।
পরিবর্তনের প্রতীক
নিজ এলাকায় তিনি শিশুদের ক্যাম্পে কাজ করেন। গাড়ি চালাতে পারার কারণে তিনি এই দায়িত্ব পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “একটি মেয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কীভাবে এই পোশাক আর গাড়ি পাওয়া যায়। তখন মনে হয়েছে, আমি আমার কাজটা ঠিকভাবেই করছি।”
আজ আফ্রিকায় পর্যটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই ধরনের নারী রেঞ্জার কর্মসূচি চালাচ্ছে একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানই।
নারীরা এখানে শুধু বন্যপ্রাণ রক্ষা করছেন না, নিজেদের জীবনও বদলে দিচ্ছেন—নীরবে, দৃঢ়ভাবে।
শালভা সারদা 


















