চীনের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও লাভজনক প্রযুক্তি শিল্পে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হলেও, এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কৌশলে পরিণত হয়েছে।
গত নভেম্বর হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে আলিবাবা গ্রুপের চেয়ারম্যান জো সাইকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কেন প্রতিষ্ঠানটি তাদের এআই মডেল উন্মুক্ত করছে। তিনি বলেন, উন্মুক্ত-সোর্স এআই খরচ কমায় এবং বিশ্বব্যাপী সুবিধা সৃষ্টি করে, যা বিশেষ করে সীমিত সম্পদ ও দক্ষতাসম্পন্ন দেশগুলোর জন্য উপযোগী।
আলিবাবার প্রধান এআই মডেল ‘কোয়েন’ গত তিন বছরে প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি ডাউনলোড হয়েছে, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় উন্মুক্ত-সোর্স মডেল পরিবারে পরিণত করেছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—এত কিছু বিনামূল্যে দিয়ে তারা আয় করে কীভাবে? জো সাই সরাসরি বলেন, “আমরা মডেল থেকে সরাসরি অর্থ উপার্জন করি না।” বরং তারা ক্লাউড ও অন্যান্য সেবা থেকে আয় করে থাকে।
উন্মুক্ত-সোর্স মডেলগুলো থেকে আয় করার প্রশ্নটি গত এক বছরে বারবার সামনে এসেছে। কারণ এসব মডেলের ওপর সরাসরি মালিকানা বা মুনাফার সুযোগ সীমিত।
চীনে ডিপসিকের আবির্ভাবের পর উন্মুক্ত-সোর্স মডেলের একটি ঢেউ তৈরি হয়। মিনিম্যাক্স ও ঝিপু এআই-এর মতো স্টার্টআপগুলো এই ঢেউয়ে ভেসে দ্রুত বাজারে অবস্থান শক্ত করে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কোম্পানি আবার তাদের নতুন মডেল বন্ধ-সোর্স হিসেবে প্রকাশ করতে শুরু করেছে, যা তাদের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত ও বন্ধ—দুই ধরনের কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করা এখন সাধারণ বিষয়। এআই মডেল আসলে একটি বড় প্রযুক্তিগত কাঠামোর শুধু একটি স্তর।
ব্যবসায়িক মডেল: পরোক্ষ আয়ের কৌশল
এআই মডেল ব্যবহার করতে শক্তিশালী কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন, যা গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। যদিও মডেল বিনামূল্যে পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলো চালানো ও উন্নত করতে বড় ব্যয় এবং দক্ষতা লাগে।
এই কারণে অনেক কোম্পানি নিজেই এই মডেল চালিয়ে ব্যবহারকারীদের কাছে সেবা দেয়। এটি একটি পরোক্ষ আয় পদ্ধতি।
জো সাই এর তুলনা করেছেন হোটেল ব্যবস্থার সঙ্গে—ব্যবহারকারী নিজে হোটেল তৈরি না করে ভাড়া নেয় এবং অতিরিক্ত সেবার জন্য অর্থ দেয়।
আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো কোম্পানিগুলো তাদের ক্লাউডের মাধ্যমে এই মডেল ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে আয় করছে।
এছাড়া তারা নিরাপত্তা, অপ্টিমাইজেশনসহ প্রিমিয়াম সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়।
এই কৌশল নতুন নয়। গুগলের অ্যান্ড্রয়েডও উন্মুক্ত-সোর্স হয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং তার মাধ্যমে গুগল তার অন্যান্য সেবার বাজার শক্ত করেছে।
তবে এই কৌশলের সীমাবদ্ধতাও আছে। তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে দাম কমে যাচ্ছে, ফলে লাভের মার্জিন কম থাকে।
আলিবাবার ক্লাউড ব্যবসার লাভ এখনো এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই বা অ্যানথ্রপিকের মতো কোম্পানিগুলো ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ করছে, কারণ তারা তাদের মডেলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে।
চীনের কোম্পানিগুলো বেশি ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করার দিকে মনোযোগ দেয়, আর যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো প্রতি ব্যবহারকারীর থেকে সর্বোচ্চ আয় করার কৌশল নেয়।
ফলে বাজারে দাম কমানোর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, যা আগে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌর প্যানেল শিল্পেও দেখা গেছে।
নতুন ধাপ: এআই এজেন্টের উত্থান
এ বছরের শুরুতে ‘ওপেনক্ল’ নামের একটি উন্মুক্ত-সোর্স এআই এজেন্ট টুল আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
এই টুল ব্যবহারকারীর হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারে। ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট মডেল বেছে নিয়ে এটি ব্যবহার করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চালাতে পারে।

এর ফলে এআই ব্যবহারের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তন ক্লাউড কোম্পানি ও এআই স্টার্টআপ—দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্যই ইতিবাচক। চাহিদা বাড়লে তারা দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবে এবং লাভও বাড়তে পারে।
এছাড়া এটি সরাসরি আয়ের সুযোগও তৈরি করতে পারে, কারণ তখন বিনামূল্যে সেবা দিয়ে ব্যবহারকারী বাড়ানোর প্রয়োজন কমে যাবে।
এই প্রবণতা ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। অনেক কোম্পানি এখন ‘মডেল-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ বা এমএএএস মডেলের দিকে ঝুঁকছে, যেখানে ব্যবহার অনুযায়ী অর্থ নেওয়া হয়।
আলিবাবা এই মডেলকে তাদের প্রধান ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। যদিও বর্তমানে এটি তাদের আয়ের ছোট অংশ, তবে আগামী পাঁচ বছরে এটি সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হবে বলে তারা আশা করছে।
এদিকে ঝিপু জানিয়েছে, তাদের এপিআই ব্যবহারের পরিমাণ প্রথম প্রান্তিকে ৪০০ শতাংশ বেড়েছে, যদিও তারা দাম ৮৩ শতাংশ বাড়িয়েছে।
হাইব্রিড কৌশল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
উন্মুক্ত-সোর্স ও বাণিজ্যিক কৌশলের মিশ্রণ এখন শিল্পে নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠছে।
তবে ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য এটি চ্যালেঞ্জিং। কারণ তারা তাদের মডেল উন্মুক্ত করলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই তা ব্যবহার করে নিজেদের সেবায় যুক্ত করতে পারে।
এ কারণে কিছু কোম্পানি এখন তাদের লাইসেন্সের শর্ত কঠোর করছে। যেমন, মিনিম্যাক্স তাদের নতুন মডেলের বাণিজ্যিক ব্যবহার সীমিত করেছে।
এই সিদ্ধান্ত উন্মুক্ত-সোর্স কমিউনিটিতে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোকে উন্মুক্ততার সুবিধা ও বাণিজ্যিক লাভের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।
চীনের এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম কম্পিউটিং ক্ষমতা থাকায় চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে।
ডিপসিকের পরবর্তী মডেল বাজারে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে, চীনের উন্মুক্ত-সোর্স এআই কৌশল একটি নতুন ব্যবসায়িক বাস্তবতা তৈরি করেছে—যেখানে বিনামূল্যে দেওয়া পণ্যের মাধ্যমেই ভবিষ্যতের আয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
ভিনসেন্ট চাও 


















