মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কায় পড়েছে। জ্বালানির অভাবে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। এতে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই শুরু হয়েছে তীব্র লোডশেডিং।
৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, উৎপাদনে বড় ঘাটতি
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে খুলনা (৩৩০ মেগাওয়াট), ফরিদপুর (৫০ মেগাওয়াট), নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি (২২৫ মেগাওয়াট), মধুমতি (১০০ মেগাওয়াট) এবং রূপসা (১০৫ মেগাওয়াট) কেন্দ্রসহ মোট ৬টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
জ্বালানি না থাকায় চালু রাখা সম্ভব নয়
খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান জানান, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র চালু রাখা যাচ্ছে না।
“জ্বালানি পেলেই আমরা উৎপাদন শুরু করতে প্রস্তুত,” বলেন তিনি।

রামপাল কেন্দ্র চালু থাকলেও চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ
বিদেশি ঋণে নির্মিত কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে গেলেও তা পুরো অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
প্রতিদিন ৩–৫ ঘণ্টা লোডশেডিং
গ্রীষ্ম মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো অপচয় রোধে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে দেশে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার সঙ্গে এই সংকট সরাসরি সম্পর্কিত। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে।
হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা বড় ঝুঁকি
প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম (ফেড) জানায়, দেশের এলএনজি আমদানির ৬৮-৭৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই রুটে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়ে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়ার আহ্বান
ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফার্নেস অয়েলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ১৮ টাকার বেশি হলেও সৌরবিদ্যুতে তা প্রায় অর্ধেক। এ প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মত: বিকল্প নেই সৌর শক্তির
প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, “বর্তমান সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। সময়মতো রূপান্তর না ঘটালে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে।”
ছাদ ব্যবহারেই উৎপাদন সম্ভব ১৬ হাজার মেগাওয়াট
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ৪ কোটির বেশি পরিবারের ছাদ ব্যবহার করে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া কৃষিখাতে সৌর সেচ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা যাবে।

নীতিগত পরিবর্তনের আহ্বান
সংকট মোকাবিলায় তারা সৌর সরঞ্জামে শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহার, বাড়িভিত্তিক সৌর প্যানেলে ভর্তুকি, দ্রুত সৌর পার্ক অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করেছেন।
গৌরাঙ্গ নন্দী সতর্ক করে বলেন, সময়মতো নীতিগত পরিবর্তন না আনলে জ্বালানি নির্ভরতা আরও বাড়বে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















