যুদ্ধের ভয়াবহতায় ভেঙে পড়া জীবনের মাঝেও মাতৃত্ব থেমে নেই। লেবাননের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নবজাতককে কোলে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন হাজার হাজার নারী। কেউ সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন, কেউ আবার অনিশ্চয়তার মধ্যেই অপেক্ষা করছেন নতুন জীবনের আগমনের জন্য।
মারিয়াম জেইন মাত্র ১১ সপ্তাহ বয়সী ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছেন একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। যুদ্ধের আগে মাতৃত্বের স্বপ্ন ছিল অন্যরকম। নিজের ঘর, নিজের বিছানা—সবকিছু সাজানো ছিল আগত সন্তানের জন্য। কিন্তু যুদ্ধ সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এখন মেঝেতে বিছানো গদির উপরই কাটছে দিনরাত।
তিনি বলেন, সন্তান জন্মের আনন্দটুকুও ঠিকভাবে উপভোগ করতে পারছেন না। নিজের ঘরবাড়ি আছে কি না, সেটাও জানেন না। একসময় যে ঘর ছিল নিরাপত্তার জায়গা, এখন তা শুধু স্মৃতি।
যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি
মার্চের শুরুতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। সরকারি হিসেবে হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। এসব কেন্দ্রে জায়গা সংকট চরমে, যেখানে শত শত মানুষ একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকছেন।
এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক মা পর্যাপ্ত গোপনীয়তার অভাবে সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারছেন না। শিশুখাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবও প্রকট।
গর্ভাবস্থার ঝুঁকি
সংস্থাগুলোর হিসেবে বিপুলসংখ্যক নারী বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের মধ্যে হাজার হাজার গর্ভবতী। তাদের অনেকেই নিয়মিত চিকিৎসা, পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শুধু শারীরিক নয়, মানসিক চাপও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যতের ভয়—সব মিলিয়ে গর্ভবতী নারীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

অস্থায়ী চিকিৎসা সেবা
কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্বাস্থ্যকর্মী মোবাইল ক্লিনিক চালু করে নারীদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছোট তাঁবুর মধ্যে বসেই করা হচ্ছে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ।
তবে এই উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। অনেক নারী নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বাইরে থেকে যাচ্ছেন, যা তাদের এবং অনাগত সন্তানের জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে মাতৃত্বের বাস্তবতা
আরেকটি আশ্রয়কেন্দ্রে গর্ভবতী ঘাদা ইসা অপেক্ষা করছেন সন্তানের জন্মের। কিন্তু পরিবেশ তাকে ভীত করে তুলছে। ছোট একটি তাঁবুতে পরিবার নিয়ে থাকতে হচ্ছে, যেখানে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত নয়।
প্রতিদিনের সাধারণ প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরের ও ভিড়পূর্ণ শৌচাগারে যাওয়া, নিরাপদে বিশ্রাম নেওয়া—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।
যমজ সন্তানের গল্প
দক্ষিণাঞ্চলের একটি শহরে আরেক মা ঘাদা ফাদেল তার যমজ সন্তানকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সন্তান জন্মের আগে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। পরে জানতে পারেন, তাদের বাড়ি আর নেই—সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি মা চায় সন্তানকে নিজের ঘরে বড় করতে। কিন্তু যুদ্ধ সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। তবুও আশা ছাড়েননি—একদিন হয়তো ফিরে যাবেন নিজের ঘরে।

মানবিক সংকটের গভীরতা
লেবাননের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন শুধু খাবার বা আশ্রয়ের সংকট নয়, মানবিক সংকটের গভীর চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল।
যুদ্ধের এই বাস্তবতায় মাতৃত্ব একদিকে যেমন আশার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি প্রতিদিনের সংগ্রামের আরেক নাম হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















