যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ইরানের আকাশে সাম্প্রতিক অভিযানে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। ৩৮ দিনের টানা বিমান হামলায় ১৩ হাজারের বেশি যুদ্ধ মিশন পরিচালনা করে ইরানের সামরিক স্থাপনা, শিল্প অবকাঠামো এবং পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে। পরিকল্পনা ও কৌশলগত দক্ষতায় এই অভিযানকে সফল বলা হলেও একই সময় পেন্টাগনের ভেতরে তৈরি হয়েছে এক গভীর অস্থিরতা—নিজেদের নেতৃত্ব নিয়েই চলছে দ্বন্দ্ব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট
নেতৃত্বের অস্থিরতা
গত ২ এপ্রিল হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে বরখাস্ত করেন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ। একই সঙ্গে আরও দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এমন একটি সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে যখন দেশটি দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ পরিচালনা করছে এবং স্থলবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে—তা অনেকের কাছেই নজিরবিহীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বরখাস্তের পেছনে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও এটি সামরিক নেতৃত্বে চলমান এক ধারাবাহিক পরিবর্তনের অংশ। গত এক বছরে অন্তত ২১ জন জেনারেলকে সরানো হয়েছে, যাদের অনেকের ক্ষেত্রেই কারণ পরিষ্কার নয়।
রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাব
পেন্টাগনের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, সেখানে প্রতিশোধমূলক মনোভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং এক ধরনের কঠোর ‘যোদ্ধা মানসিকতা’ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই মানসিকতা কখনও কখনও আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত সামরিক নীতির প্রতিও অবজ্ঞা তৈরি করছে।
অনেকের অভিযোগ, সামরিক কার্যক্রমের চেয়ে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়েই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এর ফলে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামরিক কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রভাব
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অধিকাংশই দক্ষ হলেও কিছু নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল ক্রিস্টোফার লানেভের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কারণ এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য তার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে অনেক কর্মকর্তা আগাম অবসর নিচ্ছেন বা পদোন্নতির তালিকা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করছেন। এতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ক্ষতি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইন ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব
সামরিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে নতুন প্রজন্মের আইনজীবীরা প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার জন্য আইনগত ব্যাখ্যা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এতে সেনাবাহিনীর নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, যেকোনো মূল্যে জয়লাভের মানসিকতা এখন প্রাধান্য পাচ্ছে, যা সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করছে।
দক্ষতার পেছনে শক্তি ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি
সবকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে সফল অভিযান পরিচালনা করতে পেরেছে। এর পেছনে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা এবং একটি নিরপেক্ষ পেশাদার সংস্কৃতি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান নেতৃত্ব সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু এই যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং ভবিষ্যতেও সেনাবাহিনীর কাঠামো ও কার্যকারিতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















