রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড সেবার সঙ্গে যুক্ত চালকদের বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘বাচাঁও রাইড পরিষেবা ঐক্য পরিষদ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, উবার ও পাঠাওসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের স্বেচ্ছাচারিতা, মিথ্যা মামলা এবং বিআরটিএর অবহেলার কারণে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন।
সমাবেশ শেষে একটি মিছিল সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হলে জিরো পয়েন্ট এলাকায় পুলিশ বাধা দেয়। পরে সংগঠনের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি জমা দেয়।
সমাবেশে কী বলা হলো
রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের আহ্বায়ক বেলাল আহমেদ এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব শেখ মোহাম্মদ মহসিন। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশ হালকাযান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হোসাইন বলেন, পরিবহন খাতের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার। তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার এবং রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
সেইফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সেকান্দার আলী মিনা প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালুর ওপর গুরুত্ব দেন।
সম্মিলিত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুল হাসান নয়ন পাঠাও কর্তৃক দায়ের করা মামলাকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
রাইডশেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি সোহাগ হাওলাদার বলেন, চালকরা ন্যায্য ভাড়া পাচ্ছেন না এবং তাদের আয়ের নিশ্চয়তা নেই।
অ্যাপভিত্তিক ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়নের নেতা আব্দুল্লাহ আল মারুফ জানান, প্রস্তাবিত ‘রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০২৫’ দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করে বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন, বিআরটিএর অবহেলার কারণে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, উবার ও পাঠাওয়ের লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হলেও তারা কীভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।
চালকদের সংকট ও বাস্তবতা
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চালকদের আয় কমে গেছে, কমিশন অত্যধিক হারে কাটা হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নেই। ডায়নামিক প্রাইসিং বা বিডিং ব্যবস্থার কারণে আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এছাড়া যথাযথ তদন্ত ছাড়া চালকদের আইডি বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি না পাওয়া, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি—এসব কারণে তাদের জীবন ও জীবিকা দুটোই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
দীর্ঘদিনের দাবি, সমাধান নেই
পরিষদের সদস্য সচিব শেখ মহসিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হলেও কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। একাধিকবার স্মারকলিপি ও প্রস্তাব জমা দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এজন্য তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সংগঠনের আহ্বায়ক বেলাল আহমেদ বলেন, ন্যায্য ভাড়া, যুক্তিসঙ্গত কমিশন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় চালকরা চরম সংকটে রয়েছেন। তিনি দ্রুত নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানান।
প্রধান দাবিগুলো
সংগঠনটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০২৫ দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ, সময়োপযোগী ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণ, কমিশন সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে সীমিত করা, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, তদন্ত ছাড়া আইডি বন্ধ না করা, শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, প্ল্যাটফর্ম শ্রমিকদের জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন এবং জ্বালানি সংকট নিরসনে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ।
কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা
দাবি বাস্তবায়ন না হলে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। ২০ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হবে। ২৯ এপ্রিল বিআরটিএ কার্যালয়ের দিকে রোডমার্চ ও অবস্থান কর্মসূচি এবং ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা ও স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপরও যদি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ১১ মে থেকে সারাদেশে অ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের নিয়ে কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















