পাঞ্জাবের ভারত–পাকিস্তান সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর কৃষকরা বহু বছর ধরে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মধ্যে আটকে আছেন। নিজেদের জমি থাকলেও সেই জমিতে অবাধে কাজ করতে পারেন না তারা। সীমান্তের বেড়া ও জিরো লাইনের মাঝখানে পড়ে থাকা জমি যেন তাদের জন্য ‘নিজের হলেও পরের’ হয়ে গেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে সীমান্ত বেড়া সরিয়ে আন্তর্জাতিক সীমানার আরও কাছে নেওয়ার পরিকল্পনা এই দীর্ঘ সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈশাখী উৎসবের মাঝেও অস্বস্তি
গুরদাসপুর জেলার রোসে গ্রামের কৃষকরা বৈশাখী উৎসবে নতুন ফসলের আনন্দ ভাগ করে নিলেও তাদের অনেকের জন্য এই সময়টা মিশ্র অনুভূতির। কারণ, তাদের বড় অংশের জমি সীমান্ত বেড়ার ওপারে। জমি এত কাছেই, অথচ সেখানে স্বাধীনভাবে যাওয়া যায় না—এই বাস্তবতা তাদের মনে হতাশা তৈরি করে।
সরকারি উদ্যোগে আশার আলো
কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্ত বেড়া আন্তর্জাতিক সীমানার কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিভিন্ন সীমান্ত জেলায় জরিপ চলছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা অবাধে জমিতে কাজ করতে পারবেন, ফসলের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারবেন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি পাবেন বলে আশা করছেন তারা।

কঠোর নিয়মের বেড়াজাল
বর্তমানে সীমান্তবর্তী কৃষকদের নিজেদের জমিতে যেতে হলে পরিচয়পত্র দেখাতে হয় এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ করতে হয়। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে কাজের অনুমতি দেওয়া হয়। এর বাইরে জমিতে থাকা নিষিদ্ধ।
জমিতে যাওয়ার আগে অনুমতি, কাগজপত্র, তল্লাশি—সব মিলিয়ে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি খরচ হয়। এমনকি খাবারের পাত্র, সার, বীজ বা কৃষিযন্ত্রও পরীক্ষা করা হয়। ফলে কৃষকরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন না।
ফসল উৎপাদনে বড় ক্ষতি
এই সীমাবদ্ধতার কারণে জমির সঠিক পরিচর্যা করা যায় না। কখনও গেট বন্ধ থাকলে সময়মতো জমিতে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, ফলে ফসল রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। এতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একদিকে যেখানে গ্রামের মূল জমিতে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০ কুইন্টাল গম উৎপাদন হয়, সেখানে বেড়ার ওপারের জমিতে তা নেমে আসে ৮–১০ কুইন্টালে।
নিরাপত্তা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
১৯৮০-এর দশকে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের পর থেকেই এই সমস্যা তৈরি হয়। নিরাপত্তার কারণে এই বেড়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রভাব পড়েছে কৃষকদের জীবনে। অনেক ক্ষেত্রে সীমান্তের ওপারে পশু ঢুকে ফসল নষ্ট করে, কারণ ওই পাশে কোনো বেড়া নেই।
কৃষকদের দাবি, নিরাপত্তা বজায় রেখেই বেড়াটি জিরো লাইনের কাছাকাছি সরানো হলে তারা স্বাভাবিকভাবে চাষ করতে পারবেন।

রাজ্য সরকারের সক্রিয় ভূমিকা
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, বর্তমান ব্যবস্থায় কৃষকদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমিতে যেতে হয় এবং প্রতিবারই তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। এতে কৃষকদের যেমন ভোগান্তি হয়, তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীর সময়ও নষ্ট হয়।
এই প্রেক্ষাপটে সীমান্ত বেড়া সরানোর সম্ভাবনা যাচাই করতে প্রশাসনকে জরিপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাস্তব সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা
গ্রামের প্রধানরা জানান, অনেক জায়গায় সপ্তাহে মাত্র দু’দিন গেট খোলা হয়, যা কৃষিকাজের জন্য যথেষ্ট নয়। খারাপ আবহাওয়া, বৃষ্টি বা বন্যার সময় জমিতে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া নিরাপত্তাজনিত কারণে তিন ফুটের বেশি উচ্চতার ফসল চাষ করা যায় না। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে একই ধরনের ফসল বারবার চাষ করছেন, যা মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে।
যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে। প্রতিটি যন্ত্র আগে থেকে নিবন্ধন করতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হয়। কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে নতুন করে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।’
![]()
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব
এই সমস্যার কারণে বহু কৃষক জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘদিনের এই সংকট শুধু মানবিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী বহু আসনে এর প্রভাব রয়েছে, যা আগামী নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সমাধানের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত বেড়া জিরো লাইনের সঙ্গে মিলিয়ে দিলে নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। তখন ওই এলাকার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এবং কৃষকদের আর সেখানে যেতে হবে না।
একই সঙ্গে কৃষকরাও তাদের জমিতে বাধাহীনভাবে কাজ করতে পারবেন। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি—নিজের জমিতে স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার—অবশেষে পূরণ হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















