কলকাতার শহরতলির খড়দহে নির্বাচনী মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পুরো-নারীর মিছিল দল, পুরুষদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে পেছনে। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই ধাপে ভোট। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মাসে আরও তিনটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও ভোট হচ্ছে এবং সব জায়গাতেই প্রচারণার কেন্দ্রে নারী ভোটাররা। অথচ একসময় ভারতীয় রাজনীতিতে নারী ভোটার ছিলেন গৌণ। ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রায় ৩০ লাখ নারীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল, কারণ তারা নিজেদের নামের বদলে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মা বা বোন হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন। ১৯৬২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে পুরুষদের ভোট প্রদানের হার বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ পয়েন্ট, নারীদের প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২৪ সালে পুরুষের ৬৫.৬ শতাংশের বিপরীতে নারীদের ৬৫.৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের এক আসনে যোগ্য নারীদের প্রায় ৮৮ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন।
নগদ হস্তান্তরের প্রসার
এক জাতীয় সমীক্ষায় ১০ শতাংশেরও কম নারী জানিয়েছেন, তারা মতাদর্শ বিবেচনা করে প্রার্থী বেছেছেন। হিন্দুধর্মের প্রতি হুমকি কিংবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী জাতীয় সংস্কৃতি-যুদ্ধের বিষয়ে পুরুষরা তুলনায় সহজে উত্তেজিত হন। নারীরা বেশি আকৃষ্ট হন কল্যাণমূলক বাস্তব প্রতিশ্রুতিতে। পুরুষশাসিত সমাজে দৈনন্দিন সংগ্রামই নারীদের একটি অধিক সংজ্ঞায়িত টিকে থাকার প্রবৃত্তি দিয়েছে, বলেছেন রুহি তিওয়ারি তার হোয়াট উইমেন ওয়ান্ট বইয়ে। এ কারণেই রাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিতে নারী-নির্দিষ্ট নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। ২০২২ সালে যেখানে অল্পসংখ্যক রাজ্যে এমন প্রকল্প ছিল, এখন ১৬টি রাজ্যে কেবল নারীদের জন্য নগদ হস্তান্তর প্রকল্প চালু আছে। মাসে ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ রুপি, অর্থাৎ ৯ থেকে ২৭ ডলার দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে গরিব ঘরের ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের মাসে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ রুপি দেওয়া হয়। গত নভেম্বরে বিহারের নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের শরিকরা ৭৫ লাখ নারীর অ্যাকাউন্টে জীবিকা প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার রুপি জমা করেছিল।
সমালোচনার সুরও বাড়ছে
কলকাতার এনজিও প্রতীচী ট্রাস্টের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে প্রশংসা করা হয়েছিল। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ নারী মনে করেন, প্রকল্পটি পরিবারের মধ্যে তাদের অবস্থান দৃঢ় করেছে এবং ৮৭ শতাংশ বলেছেন, এটি নিছক টিকে থাকার বাইরে স্বপ্ন দেখার, যেমন প্রশিক্ষণ বা উদ্যোগে বিনিয়োগ করার সুযোগ দিয়েছে। তবে সাবধানী পর্যবেক্ষকরা এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেক প্রকল্পই এলোমেলো, যেগুলোকে নারীর ক্ষমতায়নের মোড়কে ভোট-কেনাবেচা মনে হতে পারে। গত অর্থবছরে ভারতজুড়ে শর্তহীন নগদ হস্তান্তর প্রকল্পে, মূলত নারীদের জন্য, ১৭ ট্রিলিয়ন রুপি খরচ হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প চালু রাজ্যগুলোর প্রায় অর্ধেকেরই রাজস্ব ঘাটতি আছে। অপচয়প্রবণ পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের ঋণ জিডিপির ৩৮ শতাংশ, রেকর্ডের কাছাকাছি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার একাই রাজস্ব প্রাপ্তির ১০ শতাংশ গ্রাস করছে, আর বিজেপি প্রচারণায় এই প্রকল্পের অর্থ দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ভারতের বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী দীপ্সিতা ধরের মতে, নেতাদের উপহারের বদলে উচ্চ মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের মাধ্যমে জীবনযাত্রা বাড়ানো উচিত। ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সতর্ক করেছে, নগদ কর্মসূচি নারীদের জীবন নাটকীয়ভাবে উন্নত করতে পারে, এমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















