যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের নেতা শি জিনপিং যখন মে মাসের মাঝামাঝি বেইজিংয়ে বৈঠকে বসবেন, তখন তা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার আরেকটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় মুখোমুখি বৈঠকে ট্রাম্প এই সম্পর্ককে “জি-টু” বলে উল্লেখ করেছিলেন। মন্তব্যটি হয়তো হঠাৎ বলা হলেও, এর অর্থ ছিল—ওয়াশিংটন ও বেইজিং একসঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার নিয়ম নির্ধারণ করবে—যা পুরো অঞ্চলে আলোড়ন তোলে। অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো মার্কিন মিত্ররা তখনই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র কি তাদের ছেড়ে দিয়ে চীনকে বেশি প্রভাব দিচ্ছে?
অতীতে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই “জি-টু” ধারণাকে স্বীকার করেনি। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে সমান মর্যাদা দিতে অনিচ্ছুক ছিল, আর চীন মনে করত যুক্তরাষ্ট্র তাকে এমন দায়িত্ব নিতে বাধ্য করতে চায় যা সে নিতে চায় না। কিন্তু এবার এই ধারণা এক বাস্তবতা তুলে ধরে—এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে একসঙ্গে কাজ করতেই হবে, যদিও তাদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা রয়েছে।
এই দুই শক্তিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং ভুল বোঝাবুঝি কমাতে যৌথ দায়িত্ব নিতে হবে, বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর এলাকায়।
তবে শুধু এই দুই দেশ যথেষ্ট নয়। সম্পর্কটি এখনও অস্থির, আর অঞ্চলের চ্যালেঞ্জ এত বিস্তৃত যে তারা একা শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। এখানেই আসিয়ান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই আঞ্চলিক জোট দীর্ঘদিন ধরে বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব প্রশমনে ভূমিকা রেখেছে—সংলাপ তৈরি করে, প্রভাবকে ভারসাম্য করে এবং সংকটে উত্তরণে সহায়তা করে।
এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সহযোগিতার সঙ্গে আসিয়ানের কূটনৈতিক কাঠামোকে যুক্ত করতে হবে—যাকে বলা যেতে পারে “জি-টু প্লাস”। এতে প্রতিযোগিতা অস্বীকার না করে তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে এবং সংঘাতের ঝুঁকি কমবে।

শান্তি ধরে রাখার ভিত্তি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চল। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক যুদ্ধজনিত মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই ঘটেছে এখানে। কিন্তু এরপর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। বড় কোনো আন্তঃরাষ্ট্র যুদ্ধ আর হয়নি, যদিও সামরিক ব্যয় বেড়েছে এবং চীনের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় এশিয়া অনেক বেশি শান্ত।
এই শান্তি তিনটি প্রধান ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, দারিদ্র্য এবং অবিশ্বাস। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলোর অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা থাকে। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জোট কাঠামো ও চীনের উত্থানের মধ্যে ভারসাম্য এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
একইসঙ্গে দারিদ্র্য ও অনুন্নয়ন বিদ্রোহ, শরণার্থী সংকট ও সন্ত্রাসবাদের মতো সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু জাপানের শিল্পায়ন এবং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনে অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে।
সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো অবিশ্বাস। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ না থাকায়, প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপও আক্রমণাত্মক বলে মনে হতে পারে। ফলে এক দেশের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রচেষ্টা অন্যদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরে এই সমস্যা বিশেষভাবে স্পষ্ট।
আসিয়ানের ভূমিকা
আসিয়ান এমন একটি রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে। আসিয়ান রিজিওনাল ফোরাম ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নেতাদের নিয়মিত একত্র করে এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করে।

অনেকে আসিয়ানকে অকার্যকর বলে সমালোচনা করে, কারণ এটি সব সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। কিন্তু আসল শক্তি হলো—সংলাপ বজায় রাখা এবং উত্তেজনা সংঘাতে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানো।
আসিয়ানের “সংলাপ ও পরামর্শ” ভিত্তিক কূটনীতি ধীর ও সতর্ক হলেও, এটি যোগাযোগের পথ খোলা রাখে। এমনকি মিয়ানমারের মতো কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এই কাঠামো কাজ করেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থাও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
এছাড়া আসিয়ানের একটি বিশেষ শক্তি হলো—এটি কোনো পক্ষের জন্য হুমকি নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই এখানে স্বচ্ছন্দে আলোচনায় বসতে পারে।
শুধু দুই শক্তি নয়
বর্তমানে এশিয়ার স্থিতিশীলতা নতুন চাপের মুখে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ছে। প্রযুক্তি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিভক্ত করছে। নতুন নিরাপত্তা জোট যেমন অকাস বা কোয়াড কিছু দেশকে আশ্বস্ত করলেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে আসিয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে “জি-টু প্লাস” কাঠামো একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এতে ছোট দেশগুলোও প্রক্রিয়ার অংশ থাকবে এবং বড় শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের বাইরে পড়ে থাকবে না।
এই কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা দেবে, আর আসিয়ান দেবে আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য। নিয়মিত বৈঠক ভুল বোঝাবুঝি কমাবে এবং উত্তেজনা প্রশমনের পথ তৈরি করবে।
প্রতিযোগিতা, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা কাঠামোগত—এটি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে এর মানে এই নয় যে এক পক্ষকে জিততেই হবে। প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা না গেলে তা সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
“জি-টু প্লাস” কাঠামো উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এতে মিত্রদের আশ্বস্ত করতে পারবে, আর চীন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা নিতে পারবে। একইসঙ্গে আসিয়ানের গুরুত্বও বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে বন্ধু হতে হবে না, কিন্তু শত্রুতে পরিণত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে তা সংঘাতে রূপ না নেয়। আর এই পথের সবচেয়ে কার্যকর সূচনা হতে পারে আসিয়ানের বিদ্যমান কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে।
হুইইউন ফেং 



















