০৩:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে  বৈষম্য  ভারতের এলপিজি সরবরাহে কৌশলগত দুর্বলতা: আমদানিনির্ভর রান্নাঘরের ঝুঁকি বাড়ছে ইউপিএসসি প্রস্তুতির দীর্ঘ পথ মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছেন প্রার্থীরা পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে উত্তেজনা, সংঘর্ষ-গ্রেফতার-সেনা মোতায়েন নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক মণিপুরে নতুন করে হত্যাকাণ্ড, দ্রুত তদন্ত ও শান্তি ফেরাতে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চায় কংগ্রেস বিজেপি মহিলাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সীমা পুনর্নির্ধারণ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল: কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে.সি. ভেনুগোপাল এআইএডিএমকেকে বিজেপির  নিয়ন্ত্রণে : ওদের ভোট দেবেন না -কেজরিওয়াল চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রাকচাপায় কিশোর নিহত, দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ পশ্চিমবঙ্গে ভোটার বাদ দিতে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’: কেন এই যুক্তি প্রশ্নের মুখে এলসি পতন, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বৈশ্বিক চাপ—বাংলাদেশের ব্যবসা এখন বহুমুখী সংকটে

হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলা কেন অপরাধ ছিল: টিউডর যুগে ক্ষমতা ধরে রাখতে হেনরি অষ্টমের কঠোর আইন

ইংল্যান্ডের টিউডর যুগে শুধু রাজনীতি বা ধর্ম নয়, মানুষের বিশ্বাস আর জ্ঞানকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিলেন শাসকরা। বিশেষ করে ১৬শ শতকে রাজা হেনরি অষ্টম এমন এক আইন জারি করেছিলেন, যেখানে হাতের রেখা দেখে ভবিষ্যৎ বলা—যা আজ অনেকের কাছে বিনোদন—তখন ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার গভীর কৌশল।

টিউডর শাসন আর সন্দেহের রাজনীতি

হেনরি অষ্টমের শাসনকাল ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের সময়। ধর্মীয় সংস্কার, বিদ্রোহ আর রাজকীয় ক্ষমতার বিস্তার—সব মিলিয়ে এই সময়ে শাসকরা সমাজের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতেন। যেকোনো অচেনা ব্যক্তি বা ভিন্ন ধরনের বিশ্বাসকে তখন সন্দেহের চোখে দেখা হতো।

এই প্রেক্ষাপটে হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলা বা হস্তরেখাবিদ্যা ছিল এক ধরনের ‘গোপন জ্ঞান’, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ফলে এটি রাষ্ট্র ও ধর্মীয় শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘মিশরীয় আইন’ এবং যাযাবরদের লক্ষ্যবস্তু করা

The Tudor law that forced an occult practice underground for centuries | HistoryExtra

১৬শ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে রোমা সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। তখনকার ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল, তারা মিশর থেকে এসেছে—এই ভুল ধারণা থেকেই ‘জিপসি’ শব্দটির উৎপত্তি।

এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে হেনরি অষ্টম ‘মিশরীয় আইন’ নামে কিছু আইন প্রণয়ন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এমন সব চর্চা বন্ধ করা, যা রাষ্ট্রের নজরদারির বাইরে চলে যায়। এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিল হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলাকে অবৈধ ঘোষণা করা।

ধর্মীয় সংস্কার ও জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ

হেনরি অষ্টম যখন রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে ইংল্যান্ডের চার্চের প্রধান ঘোষণা করেন, তখন জ্ঞান ও বিশ্বাসের উৎসও তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

এই সময়ে হস্তরেখাবিদ্যা বিশেষভাবে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে, মৌখিকভাবে প্রচলিত এবং প্রায়ই নারীদের দ্বারা চর্চিত। ফলে এটি রাজকীয় কর্তৃত্বের জন্য একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখা হয়।

নিষেধাজ্ঞা বাড়াল কৌতূহল

আইন করে নিষিদ্ধ করা হলেও, এই গোপন জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ কমেনি। বরং উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত মহলের কিছু মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হন। এমনকি বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনও হস্তরেখাবিদ্যা নিয়ে লেখা বই সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়।

The Tudor law that forced an occult practice underground for centuries | HistoryExtra

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আইন বহাল

এই নিষেধাজ্ঞা এক-দুই দশক নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চালু ছিল। ১৮শ ও ১৯শ শতকেও এই আইন কার্যকর ছিল, এমনকি লন্ডনের কিছু এলাকায় হস্তরেখাবিদদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল এই আইনের ধারায়।

বিনোদন থেকে ঐতিহ্যে রূপান্তর

যদিও রাষ্ট্র এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিল, রোমা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই চর্চা টিকে ছিল। বিশেষ করে নারীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য বহন করে আসেন।

১৯শ শতকে এসে এটি ব্রিটিশ সমাজে এক ধরনের বিনোদনে পরিণত হয়। ব্ল্যাকপুলের মতো জায়গায় ভাগ্য গণনা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা আগে ছিল রাষ্ট্রের চোখে হুমকি।

ক্ষমতা ধরে রাখার এক কৌশল

শেষ পর্যন্ত, হেনরি অষ্টমের এই আইন শুধু কুসংস্কার দমনের জন্য ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান ও বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা এবং সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য নিজের পক্ষে রাখা।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে  বৈষম্য 

হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলা কেন অপরাধ ছিল: টিউডর যুগে ক্ষমতা ধরে রাখতে হেনরি অষ্টমের কঠোর আইন

০১:০৩:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

ইংল্যান্ডের টিউডর যুগে শুধু রাজনীতি বা ধর্ম নয়, মানুষের বিশ্বাস আর জ্ঞানকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিলেন শাসকরা। বিশেষ করে ১৬শ শতকে রাজা হেনরি অষ্টম এমন এক আইন জারি করেছিলেন, যেখানে হাতের রেখা দেখে ভবিষ্যৎ বলা—যা আজ অনেকের কাছে বিনোদন—তখন ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার গভীর কৌশল।

টিউডর শাসন আর সন্দেহের রাজনীতি

হেনরি অষ্টমের শাসনকাল ছিল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের সময়। ধর্মীয় সংস্কার, বিদ্রোহ আর রাজকীয় ক্ষমতার বিস্তার—সব মিলিয়ে এই সময়ে শাসকরা সমাজের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতেন। যেকোনো অচেনা ব্যক্তি বা ভিন্ন ধরনের বিশ্বাসকে তখন সন্দেহের চোখে দেখা হতো।

এই প্রেক্ষাপটে হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলা বা হস্তরেখাবিদ্যা ছিল এক ধরনের ‘গোপন জ্ঞান’, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। ফলে এটি রাষ্ট্র ও ধর্মীয় শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘মিশরীয় আইন’ এবং যাযাবরদের লক্ষ্যবস্তু করা

The Tudor law that forced an occult practice underground for centuries | HistoryExtra

১৬শ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে রোমা সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। তখনকার ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল, তারা মিশর থেকে এসেছে—এই ভুল ধারণা থেকেই ‘জিপসি’ শব্দটির উৎপত্তি।

এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে হেনরি অষ্টম ‘মিশরীয় আইন’ নামে কিছু আইন প্রণয়ন করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এমন সব চর্চা বন্ধ করা, যা রাষ্ট্রের নজরদারির বাইরে চলে যায়। এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ছিল হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলাকে অবৈধ ঘোষণা করা।

ধর্মীয় সংস্কার ও জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণ

হেনরি অষ্টম যখন রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে ইংল্যান্ডের চার্চের প্রধান ঘোষণা করেন, তখন জ্ঞান ও বিশ্বাসের উৎসও তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

এই সময়ে হস্তরেখাবিদ্যা বিশেষভাবে সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরে, মৌখিকভাবে প্রচলিত এবং প্রায়ই নারীদের দ্বারা চর্চিত। ফলে এটি রাজকীয় কর্তৃত্বের জন্য একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখা হয়।

নিষেধাজ্ঞা বাড়াল কৌতূহল

আইন করে নিষিদ্ধ করা হলেও, এই গোপন জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ কমেনি। বরং উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত মহলের কিছু মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হন। এমনকি বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনও হস্তরেখাবিদ্যা নিয়ে লেখা বই সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়।

The Tudor law that forced an occult practice underground for centuries | HistoryExtra

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আইন বহাল

এই নিষেধাজ্ঞা এক-দুই দশক নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চালু ছিল। ১৮শ ও ১৯শ শতকেও এই আইন কার্যকর ছিল, এমনকি লন্ডনের কিছু এলাকায় হস্তরেখাবিদদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল এই আইনের ধারায়।

বিনোদন থেকে ঐতিহ্যে রূপান্তর

যদিও রাষ্ট্র এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিল, রোমা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই চর্চা টিকে ছিল। বিশেষ করে নারীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য বহন করে আসেন।

১৯শ শতকে এসে এটি ব্রিটিশ সমাজে এক ধরনের বিনোদনে পরিণত হয়। ব্ল্যাকপুলের মতো জায়গায় ভাগ্য গণনা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা আগে ছিল রাষ্ট্রের চোখে হুমকি।

ক্ষমতা ধরে রাখার এক কৌশল

শেষ পর্যন্ত, হেনরি অষ্টমের এই আইন শুধু কুসংস্কার দমনের জন্য ছিল না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান ও বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা এবং সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য নিজের পক্ষে রাখা।