পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন একটি যুক্তি সামনে এনেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন—‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি। কিন্তু বাস্তবে এই যুক্তির প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তুলছে, কারণ বহু ভোটারের কাছে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
পুরনো ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও বাদ পড়ছেন অনেকে
যেমন, শুক্লা হাজরা নামে এক নারী ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিলেন এবং বর্তমানে তার বৈধ পাসপোর্টও রয়েছে। একইভাবে আরও কয়েকজন ভোটার তাদের পরিবারসহ ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক প্রমাণ করতে পেরেছেন। তবুও তাদের নাম মুছে ফেলা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলি আলাদা নয়—এ ধরনের উদাহরণ হাজার হাজার রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
কী এই ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’?
নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট অসঙ্গতিকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বলা হচ্ছে। যেমন:
- বর্তমান তালিকার নামের সঙ্গে ২০০২ সালের তালিকার মিল না থাকা
- ভোটার ও তার বাবা-মায়ের বয়সের অস্বাভাবিক ব্যবধান
- দাদা-দাদির সঙ্গে বয়সের অস্বাভাবিক পার্থক্য
- এক ব্যক্তির সঙ্গে অনেক সন্তানের নাম যুক্ত থাকা
এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভোটারদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
লক্ষ লক্ষ ভোটার বাদ
এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১.৩৬ কোটি নাম চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে ৬০ লাখের বেশি ক্ষেত্রে যাচাই হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ে।
এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ভোটার বাদ দেওয়ার ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে
প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারদের মতে, অতীতে ডুপ্লিকেট নাম শনাক্ত করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দেওয়া হতো, শুনানির সুযোগ থাকত এবং আপিলের সময় দেওয়া হতো।
কিন্তু এবার অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রেই ভোটারদের যথাযথভাবে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে এটি ভোটাধিকার হরণের শামিল হতে পারে।
নামের বানান বা সামান্য পরিবর্তনেও সমস্যা’

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নামের বানান পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে লেখা থাকার কারণে ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
যেমন, কেউ আগে এক নামে ছিলেন, পরে অন্য নামে সংশোধন করেছেন—এই পরিবর্তনকেই অসঙ্গতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ তাদের পূর্বের রেকর্ড ও অন্যান্য কাগজপত্র বৈধ।
আদালতের হস্তক্ষেপ
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, যেসব ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুনরায় সুযোগ দিতে হবে।
যারা ট্রাইব্যুনালে নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে পারবেন, তাদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন এই যুক্তি ‘অযৌক্তিক’ বলে সমালোচনা?
সমালোচকদের মতে:
- এই ধরনের মানদণ্ড আগে এত বড় পরিসরে ব্যবহার হয়নি
- ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ শব্দটির স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই

- একই পরিবারের কিছু সদস্য তালিকায় থাকলেও অন্যরা বাদ পড়ছেন
- বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও নাম কাটা হচ্ছে
ফলে পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও যুক্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া এখন রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে। নির্বাচন কমিশনের নতুন যুক্তি কতটা যৌক্তিক, আর কতটা ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ করছে—তা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ছে নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















