যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে, আর তার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গভীর অবিশ্বাস। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতীত সিদ্ধান্ত ও সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ইরানের কাছে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে তাকে বিশ্বাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
বিশ্বাস সংকটের মূল কারণ
ইরানের নেতারা মনে করেন, অতীতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতেও তেমনটি ঘটতে পারে। ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে দীর্ঘ আলোচনার পর হওয়া পারমাণবিক চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা ইরানের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে।
পরবর্তীতে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও ইরান বারবার নিশ্চয়তা চেয়েছে—যেন ভবিষ্যতে আবার কোনো মার্কিন প্রশাসন চুক্তি ভেঙে না দেয়। কিন্তু এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

আলোচনার মাঝেই হামলার অভিযোগ
ইরানের সন্দেহ আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে। আলোচনা চলাকালীন সময়েই বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা আরও কমে গেছে।
সাম্প্রতিক আলোচনার প্রথম ধাপ ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার অভাবই প্রধান বাধা। নতুন করে আলোচনা চালানোর চেষ্টা হলেও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি।
ধাপে ধাপে কৌশল
এই পরিস্থিতিতে ইরান এখন সতর্ক কৌশল নিচ্ছে। তারা ধাপে ধাপে চুক্তির দিকে এগোতে চায় এবং গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—বিশেষ করে ইউরেনিয়াম মজুত—নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় যতদিন সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই অবস্থান মূলত ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর একটি প্রচেষ্টা।
দুই পক্ষের পারস্পরিক সন্দেহ

এই অবিশ্বাস শুধু ইরানের দিক থেকে নয়। যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তথ্য গোপন করেছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।
ফলে দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক এখন প্রায় ভেঙে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন।
ইসরায়েল ইস্যুতে নতুন উদ্বেগ
ইরানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক। ইসরায়েল যে কোনো সময় আবার হামলা শুরু করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। ইরান মনে করে, এই সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই কূটনৈতিক পথ থেকে সরে যেতে পারে।
চুক্তির জটিল বাস্তবতা
নতুন কোনো চুক্তি করতে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শর্তের অসমতা। ইরানকে যেসব ছাড় দিতে হবে, সেগুলো স্থায়ী এবং ফেরত নেওয়া কঠিন—যেমন ইউরেনিয়াম মজুত কমানো।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড়, যেমন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, তা সহজেই আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই বৈষম্য ইরানের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সময়ের বাস্তবতা বনাম দ্রুত সমাধান
ট্রাম্প দ্রুত চুক্তির কথা বললেও কূটনীতিকরা মনে করেন, এমন জটিল সমঝোতা অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের চুক্তি করতে দীর্ঘ সময় লাগে।
অতীতের ছায়া এখনও স্পষ্ট
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি প্রায় ২০ মাস আলোচনার পর হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে সেটি বাতিল হওয়ার পর ইরান ধীরে ধীরে সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে তাদের কর্মসূচি এগিয়ে নেয়।
এই অভিজ্ঞতাই এখন ইরানের অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলেছে। তারা কোনো প্রতিশ্রুতিকে সহজে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত নয়।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
সবকিছু মিলিয়ে, দুই পক্ষই আলোচনায় আগ্রহী থাকলেও বাস্তবতা বলছে—বিশ্বাসের এই সংকট কাটানো না গেলে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা খুবই কম।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই সন্দেহ ও কৌশলগত হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শান্তির পথ তাই এখনও অনিশ্চয়তায় ঢাকা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















