তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক এলাকায় দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। অথচ সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের অমিল দেখা যাচ্ছে, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে।
চাহিদা বাড়ছে, সরবরাহ কমছে
এপ্রিল থেকে জুন—এই সময়টায় স্বাভাবিকভাবেই দেশে তাপমাত্রা বাড়ে এবং তার সঙ্গে বাড়ে বিদ্যুতের চাহিদাও। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে জ্বালানি সংকটের কারণে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গ্রীষ্মে চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু উৎপাদন থাকছে তার অনেক নিচে। ফলে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ঘাটতি।
জ্বালানি ঘাটতি ও কেন্দ্র বন্ধ
দেশের মোট ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় একটি অংশ বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু নেই। জ্বালানি সংকটের কারণে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক কেন্দ্র আংশিক উৎপাদন করছে। গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জ্বালানির ঘাটতি সরাসরি উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।

লোডশেডিংয়ের তথ্যে গরমিল
সরকারি সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতি একেক সংস্থা একেকভাবে তুলে ধরছে। বিশেষ করে গ্রামীণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ঘাটতি অনেক বেশি হলেও সেটি সরকারি হিসেবে কম দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত সংকটের চিত্র আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলাকালে লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী বলছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে মনোযোগ ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে।
কৃষিতে সেচ সংকট
বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে সেচ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় সেচপাম্প চালানোর সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্পে উৎপাদন হুমকির মুখে
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিল্প খাতেও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটে বিকল্প ব্যবস্থাও চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমাধানের চেষ্টায় সরকার
সংকট কাটাতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়মূলক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন অফিস সময় কমানো এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত বন্ধ করার নির্দেশনা। পাশাপাশি বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সামনের দিন নিয়ে শঙ্কা
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, এই গ্রীষ্মে একাধিক তাপপ্রবাহ হতে পারে, যার মধ্যে কয়েকটি তীব্র হতে পারে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট যদি কাটানো না যায়, তাহলে সামনে আরও বড় ধরনের বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।
গরমের এই সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন শুধু একটি সেবাগত সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষা, কৃষি ও শিল্প—সব খাতেই গভীর প্রভাব ফেলছে।
লোডশেডিং বাড়ছে, সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক—বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত গ্রাম ও শিল্প
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















