টোকিওর বিখ্যাত জিম্বোচো বইপাড়া—যেখানে পুরোনো বইয়ের দোকান আর কফিশপ মিলিয়ে এক অনন্য আবহ—এখন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের নতুন আকর্ষণ। জাপানি সাহিত্যের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা ও পর্যটনের রেকর্ড বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বইপাড়াটিও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই ঐতিহ্যবাহী বইয়ের দোকানগুলো কি বিদেশি পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের বদলাবে, নাকি আগের মতোই থাকবে?
বিদেশে জনপ্রিয় জাপানি সাহিত্য, দেশে ভাষার বাধা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানি সাহিত্য আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পুরস্কারজয়ী ও বেস্টসেলার বইয়ের তালিকায় জাপানি লেখকদের উপস্থিতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একই সময়ে ২০২৫ সালে জাপানে পর্যটকের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখে। এই দুই প্রবণতা মিলিয়ে বইকেন্দ্রিক ভ্রমণও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, বিশেষ করে জিম্বোচো এলাকায়।
তবে বাস্তবতা হলো, জাপানের অধিকাংশ বইয়ের দোকানে প্রায় সব বইই জাপানি ভাষায়। ফলে বিদেশি পর্যটকরা দোকানে ঢুকে দেখেন, কিন্তু কিনতে পারেন না। এই ভাষাগত সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বদলাবে কি দোকানগুলোর ধরণ?
জিম্বোচোর বেশিরভাগ বইয়ের দোকানই ছোট, পারিবারিকভাবে পরিচালিত। সীমিত সম্পদের কারণে তারা পর্যটকদের জন্য আলাদা বই মজুদ করার কথা ভাবছে না। দোকান মালিকদের মতে, অধিকাংশ পর্যটক বই কিনতে নয়, বরং পরিবেশ উপভোগ করতে আসেন—ছবি তোলেন, ঘুরে দেখেন, তারপর চলে যান।
তবে বড় চেইন দোকানগুলো ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার বইয়ের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। পর্যটক ও বিদেশি বাসিন্দাদের চাহিদা মেটাতে নতুন ভাষার বই যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে বড় দোকানগুলো ধীরে ধীরে বহুভাষিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
প্রকাশনা খাতে চাপ, সুযোগও আছে
জাপানে বইয়ের দোকানের সংখ্যা অনেক হলেও দেশটির জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং ই-বুকের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। এতে প্রকাশনা ও বই বিক্রির খাত চাপে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি ভাষার বইয়ের চাহিদা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে এই সুযোগ কাজে লাগাতে শুরু করেছে। দোকানে ইংরেজি সাইনবোর্ড, বিদেশি গ্রাহকসেবা প্রশিক্ষণসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প পথ খুঁজছেন বিদেশি পাঠকরা
বিদেশি ভাষার বইয়ের অভাব পূরণে বিভিন্ন বই বিনিময় কমিউনিটি, ছোট ইংরেজি বইয়ের দোকান ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। এছাড়া জিন সংস্কৃতি বা ছোট প্রকাশনার মাধ্যমে বহুভাষিক বইয়ের বিকল্প বাজারও তৈরি হচ্ছে।
লাইব্রেরিগুলোতেও কিছু বহুভাষিক বই থাকলেও বাজেট সংকটের কারণে নতুন বই সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বই নয়, অভিজ্ঞতাই বড় আকর্ষণ
অনেক পর্যটকের কাছে বই কেনা নয়, বরং জাপানি বইয়ের দোকানের পরিবেশটাই প্রধান আকর্ষণ। স্টেশনারি, শিল্পকর্ম, ফটোবুক—এসব পণ্যও তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে নান্দনিক নকশার দোকানগুলো আলাদা করে নজর কাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিম্বোচোর আসল শক্তি তার সামগ্রিক পরিবেশ—একটি সম্পূর্ণ বইপাড়ার অভিজ্ঞতা। এখানে মানুষ বইয়ের ভিড়ে হারিয়ে যেতে চায়, ভাষা বুঝুক বা না-ই বুঝুক।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
জিম্বোচোর অনেক দোকানই ভবিষ্যতে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। নতুন প্রজন্ম ব্যবসা চালিয়ে নেবে কি না, সেটাও প্রশ্ন। তবু ঐতিহ্য রক্ষা আর আধুনিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাপানের বইয়ের দোকানগুলো একদিকে যেমন নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের চাপও এড়িয়ে যেতে পারছে না। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে এক নতুন বাস্তবতা—যেখানে বইয়ের ভাষা নয়, অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠছে প্রধান আকর্ষণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















