কলকাতা, ২৫ এপ্রিল: মহানগরের বিস্তৃত ও অভিজাত রাশবিহারী বিধানসভা কেন্দ্র—যেখানে সারি সারি পুরনো উচ্চবিত্তের বাড়ি—সেখানে এবার জমে উঠেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। বিজেপির স্বপন দাশগুপ্ত, যিনি একজন বুদ্ধিজীবী থেকে রাজনীতিবিদ হয়েছেন, মুখোমুখি হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক দেবাশিস কুমারের।
দক্ষিণ কলকাতার কালিঘাট থেকে বালিগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত রাশবিহারী অ্যাভিনিউর দু’পাশে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল একসময় ছিল বাংলার অনেক নামী বুদ্ধিজীবী পরিবারের আবাস। ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, লেখিকা নবনীতা দেব সেন এবং ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক উদ্ভাবনের জন্য খ্যাত দ্বারকানাথ গুপ্তের মতো ব্যক্তিত্বদের উত্তরসূরিরা এই এলাকায় বাস করেছেন।
প্রথম নজরে তৃণমূলের অভিজ্ঞ নেতা দেবাশিস কুমারকে এগিয়ে মনে হলেও এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গত নির্বাচনে প্রায় ২১ হাজার ভোটে জয়ী হওয়া কুমার এলাকায় তাঁর সরাসরি কাজের জন্য জনপ্রিয়। তবে নির্বাচনের আগে আয়কর দপ্তরের অভিযানে তাঁর ঘনিষ্ঠ কিছু সম্পত্তিতে তল্লাশি চালানো হয়। এছাড়া, একটি বিতর্কিত জমি দখল মামলায় তাঁর নাম জড়ানোয় ইডি-র জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয়েছে।
এই তল্লাশির প্রতিবাদে তাঁর বাড়ির সামনে তৃণমূল কর্মীদের বিক্ষোভও হয়। তবে কুমার এতে বিচলিত নন। এক চায়ের দোকানে বসে তিনি বলেন, “আমরাই জিতব। বাংলার মানুষ বিজেপির ‘বাঙালি অস্মিতা’-র ওপর আক্রমণ মেনে নেয় না।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের নামে বহু প্রকৃত ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বিজেপির কৌশলের অংশ। “এইভাবে চাপ সৃষ্টি করে লাভ হবে না, শেষ পর্যন্ত জিতবে বাংলা,” বলেন তিনি।
অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্তও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে এলাকায় সময় কাটাচ্ছেন। তিনিও স্থানীয় চায়ের দোকানে বসে মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। এ নিয়ে কুমার হাসতে হাসতে বলেন, “আমি এখানে সারা বছরই থাকি, স্বপনদাও চাইলে যে কোনও দিন এসে চা খেতে পারেন।”
দাশগুপ্ত মনে করেন, ভোটে মাত্র ৫ শতাংশ সুইং হলেই রাজ্যে সরকার বদলানো সম্ভব। তাঁর দাবি, “এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।”

তবে রাশবিহারীতে এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ৮.৫ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধান। এলাকার মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশ শিল্প ও কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা বিজেপির পক্ষে যেতে পারে।
সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা দাশগুপ্ত পরবর্তীতে বিশিষ্ট মতামত লেখক হিসেবে পরিচিতি পান এবং পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। তাঁর মতে, কর্মসংস্থানের অভাব ও যুবকদের অন্য শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতা ভোটারদের মনোভাব বদলে দিচ্ছে। “মানুষ শুধু অনুদান নয়, কাজ চায়,” তিনি বলেন।
তিনি আরও জানান, দক্ষিণ কলকাতার কিছু এলাকা ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের কেন্দ্র না হয়ে অবসরজীবনের এলাকায় পরিণত হচ্ছে।
একসময় শিল্পে এগিয়ে থাকা পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিনের শিল্পহ্রাসের কারণে অর্থনৈতিক গতি হারিয়েছে বলে দাবি দাশগুপ্তর। তাঁর মতে, বহু ব্যবসা অন্যত্র চলে যাওয়ায় কলকাতার কর্পোরেট ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।
তবে দেবাশিস কুমারের নেতৃত্বে এলাকায় নতুন ধরনের ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। ক্যাফে, বইয়ের ক্যাফে এবং বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে রাশবিহারীর অলিগলিতে। পাশাপাশি বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক শিল্প, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশনা সংস্থাও গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় বাজারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
অর্থনীতির পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয়ও তুলে ধরেছেন দাশগুপ্ত। তাঁর অভিযোগ, “কাটমানি” এখন দৈনন্দিন লেনদেনের অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্যোক্তা বাপি সাহা বলেন, “এখানকার মানুষ এমন একজনকে চান, যিনি তাঁদের সমস্যায় পাশে থাকবেন। বাড়ি বদলানো থেকে শুরু করে সন্তানের স্কুলে ভর্তি—সব ক্ষেত্রেই সাহায্য দরকার। বিধায়করা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন না, তাঁরা মানুষের সরাসরি সহায়তা দেন।”
এই পরিস্থিতিতে রাশবিহারী কেন্দ্রের লড়াই শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং উন্নয়ন, পরিচয় ও মানুষের প্রত্যাশারও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।
জয়ন্ত রায় চৌধুরী 


















