ইরান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি অবরোধের প্রভাব নিয়ে বিশ্ববাজার এখনো অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। পর্দায় দেখা দাম অনেককে আশ্বস্ত করছে, যেন বড় কোনো বিপদ সামনে নেই। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতির ওপর এর চাপ ধীরে ধীরে জমছে। জ্বালানি, সার, ধাতু ও শিল্প কাঁচামালের সরবরাহে যে আঘাত তৈরি হচ্ছে, তা এখনো পুরোপুরি বাজারদরে ধরা পড়েনি।
সাধারণত শেয়ারবাজারকে ভবিষ্যৎ সংকেত ধরার একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতিবিদেরা মন্দার পূর্বাভাস দেওয়ার আগেই অনেক সময় বাজার পড়ে যায়। আবার মন্দা কাটার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই বাজার ঘুরে দাঁড়ায়। লাখো বিনিয়োগকারীর সিদ্ধান্ত অনেক তথ্যকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি অবরোধের মতো সরবরাহ সংকট আলাদা ধরনের ঘটনা। এখানে ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে শুধু দামে দেখা যায় না। তেল, গ্যাস, সার, হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়ামসহ বহু পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় চাপ ধীরে ধীরে ছড়ায়। ফলে শেয়ারবাজার ও অনেক পেশাদার বিনিয়োগ বিশ্লেষকও এমন ঝুঁকি পুরোপুরি বুঝতে দেরি করেন।

বাজারের ভুল পড়ার পুরোনো উদাহরণ
এই ধরনের অবমূল্যায়নের উদাহরণ আগেও দেখা গেছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে করোনাভাইরাস এমন গতিতে ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাধারণ কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবু বিনিয়োগ কৌশলবিদেরা অনেক দিন ধরে সংক্রমণের সংখ্যা দেখে নানা পরিস্থিতি আঁকছিলেন। পুরো বিশ্ব যে কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে, সেটি তাদের প্রধান অনুমান ছিল না।
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। জরুরি পরিস্থিতির প্রকৃত গভীরতা বহু আমেরিকানের কাছে স্পষ্ট হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল। হরমুজ সংকটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আত্মতুষ্টি দেখা যাচ্ছে। পার্থক্য হলো, এবার সতর্কবার্তা সবচেয়ে জোরালোভাবে আসছে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।
পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের জশ মার্টিন সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শেয়ারবাজার যে বিষয়টি প্রায় উপেক্ষা করছে, তা তাকে বিস্মিত করেছে। সাধারণ ভোক্তার কাছে এখনো সংকটটি বিমূর্ত। পাম্পে জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ আছে, কিন্তু শারীরিক ঘাটতি না থাকায় কোটি কোটি ব্যারেল সরবরাহ হারানোর বিষয়টি দূরের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে।

ঠিক যেমন উহানে নিউমোনিয়ার হাজার হাজার সংক্রমণ প্রথমে অনেকের কাছে দূরবর্তী খবর ছিল, তেমনি হরমুজ অবরোধও এখনো বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পুরো আঘাত করেনি। কিন্তু সেই আঘাত আসতে শুরু করলে তা ভ্রমণ, উৎপাদন ও শিল্প সরবরাহব্যবস্থায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এশিয়া ও ইউরোপে আগে ধাক্কা, পরে যুক্তরাষ্ট্রেও চাপ
সংকটের সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতেও বড় অর্থনীতিগুলোর সামনে এক ধরনের ব্যথার ঢেউ আসছে। প্রথমে এশিয়ায় ভ্রমণ বিঘ্ন, জেট জ্বালানির চাপ এবং কারখানা বন্ধের খবর বাড়তে পারে। এরপর ইউরোপেও একই ধরনের প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক দূরে থাকলেও সে চাপ থেকে মুক্ত থাকবে না। আমেরিকান কোম্পানির ক্রেতা, সরবরাহকারী ও কারখানা অনেকাংশে এশিয়া ও ইউরোপের ওপর নির্ভরশীল।
সেরা পরিস্থিতিতেও জেট জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল বাজার স্বাভাবিক হতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কৃষি খাত আরও দীর্ঘ সময় চাপ অনুভব করতে পারে, কারণ সার সরবরাহ ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ফসল উৎপাদনচক্রে ধীরে ধীরে পড়ে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কারণ প্রধান উৎপাদক কাতারের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে বছর লেগে যেতে পারে।
এই সংকট করোনার মতো নয়। উচ্চ দাম ইতিমধ্যে চাহিদা কিছুটা কমাচ্ছে। সংকটও মহামারির মতো হঠাৎ ও সর্বব্যাপী নয়। তবু বিপদের মাত্রা কম নয়। কৌশলগত মজুত থেকে ছাড়া জ্বালানি, সমুদ্রে থাকা সরবরাহ এবং সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ইরানের নিজস্ব উল্লেখযোগ্য রপ্তানি প্রাথমিক ধাক্কা কিছুটা নরম করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে পরিস্থিতি এখনো তুলনামূলক কম গুরুতর মনে হচ্ছে।
কিন্তু ক্ষতি জমছে। জ্বালানি ভবিষ্যৎ বাজারও পুরো সংকট দেখাচ্ছে না, কারণ সামান্য আশার খবরই দাম বৃদ্ধির ওপর বাজি ধরা অবস্থানগুলো ভেঙে দেয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অপরিশোধিত তেলের দামে ব্যারেলপ্রতি ইতিহাসের অন্যতম বড় পতনের ঘটনাও ঘটেছে। এতে বাজারে ভুল স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ অবরোধ শেষ হলেও প্রভাব দ্রুত শেষ হবে না। সরবরাহব্যবস্থা আবার মসৃণ হতে সময় লাগবে। উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয়, খাদ্যশস্যের খরচ এবং শিল্প কাঁচামালের ঘাটতি ধাপে ধাপে কোম্পানির মুনাফা ও ভোক্তার ব্যয়ে চাপ তৈরি করবে। আজ যে ঝুঁকিকে বাজার ছোট করে দেখছে, সেটিই কয়েক মাস পর বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















