পেরুতে নির্বাচন মানেই এক সময় ছিল উৎসবের আবহ। কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই পরিচিত চিত্রকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। ভোটের দিনটি হয়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলা, হতাশা আর অনিশ্চয়তার প্রতীক। ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন, দেরিতে নির্বাচন সামগ্রী পৌঁছানো এবং বহু কেন্দ্র খুলতেই না পারার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ভোটের দিন বিশৃঙ্খলার চিত্র
রাজধানী লিমায় ভোটের দিন সকাল থেকেই দেখা যায় অব্যবস্থাপনা। অনেক ভোটকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে ভোটারদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বাধ্যতামূলক ভোটদান থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, যারা ভোট দিতে পারেননি তাদের জরিমানা করা হবে না। তবে এতে মানুষের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। অনেকের প্রশ্ন—ভোট যদি অধিকার হয়, তবে সেটি নিশ্চিত করা হলো না কেন?
এই পরিস্থিতির কারণে প্রায় ২০০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত বাড়াতে হয়। ঘটনার পর নির্বাচনী সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেন, যা পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতাকে আরও স্পষ্ট করে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘ ছায়া
গত কয়েক বছরে পেরুর রাজনীতি ছিল চরম অস্থিরতায় ভরা। ২০১৬ সালের পর থেকে দেশটিতে একের পর এক সরকার পরিবর্তন হয়েছে। একাধিক সাবেক প্রেসিডেন্ট কারাগারে গেছেন, কেউ আবার গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মহত্যা করেছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থীর সংখ্যা ছিল নজিরবিহীন। কিন্তু এত প্রার্থীর ভিড়েও কেউই শক্তিশালী সমর্থন গড়ে তুলতে পারেননি। ফলে ভোটের ফলাফলও হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত।
নির্বাচনী দৌড়ে অনিশ্চয়তা
প্রথম দফার ভোটে কেইকো ফুজিমোরি এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় দফায় জায়গা নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কে হবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বামপন্থী রবার্তো সানচেজ ও কট্টর রক্ষণশীল রাফায়েল লোপেজ আলিয়াগার মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। চূড়ান্ত ফল পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মূলত ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা সামনে এসেছে। একদিকে কঠোর নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ—এই দুই স্রোত ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি করেছে।

সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে
নির্বাচনে জালিয়াতির প্রমাণ না মিললেও রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেনি। বরং ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ও অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এক পক্ষ নির্বাচন বাতিলের দাবি তুলছে, অন্য পক্ষ রাস্তায় নামার আহ্বান জানাচ্ছে। এতে করে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কাও বাড়ছে।
বিশেষ করে রাজধানীতে ভোটগ্রহণের ব্যর্থতা কিছু প্রার্থীর জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও চাপ

এই অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত চুক্তি কার্যকর হলেও, এর জেরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন। এতে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
যেই নির্বাচনে জিতুক না কেন, তার সামনে থাকবে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শীর্ষ প্রার্থীরা মিলেও মোট ভোটের অর্ধেকের কম পেয়েছেন। ফলে নতুন সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
পেরুর বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জনগণের আস্থাহীনতা একসঙ্গে মিলে একটি বিস্ফোরক পরিবেশ তৈরি করেছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে দেশটির গণতন্ত্র আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















