২০১৮ সালে যখন কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়, তখন তাদের স্লোগান ছিল ‘একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ’। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে সেই ঐক্যের ছবিটাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বাণিজ্য বিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে উত্তর আমেরিকার সম্পর্ক এখন এক অস্বস্তিকর অবস্থায় পৌঁছেছে।
সম্পর্কের অবনতির প্রকাশ
সাম্প্রতিক সময়ে তিন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যেই সম্পর্কের অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকোর মাদকচক্র নিয়ে কঠোর অবস্থানের হুমকি দিয়েছেন, এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কথাও বলেছেন। এর জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সরাসরি বলেছেন, প্রতিবেশীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কথার লড়াইয়ের বাইরে বাস্তব ক্ষেত্রেও উত্তেজনা বেড়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য নীতিতে।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা

তিন দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ এখন বড় এক অনিশ্চয়তার মুখে। এই চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে আলোচনা চললেও সহজে তা নবায়ন হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র গাড়ির উৎপাদনে কঠোর নিয়ম আরোপ করতে চায়, যাতে চীনা উপাদানের ব্যবহার কমে। পাশাপাশি কানাডার কৃষি খাতেও প্রবেশাধিকারের দাবি তুলছে তারা। ইতিমধ্যে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও চাপ
মেক্সিকো ও কানাডা উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মেক্সিকোর প্রায় ৮৫ শতাংশ রপ্তানি যায় যুক্তরাষ্ট্রে, আর কানাডার ক্ষেত্রেও এই হার প্রায় ৭০ শতাংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এড়ানো তাদের জন্য কঠিন। তবে দুই দেশ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। মেক্সিকো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আপসের পথ বেছে নিয়েছে, আর কানাডা নতুন বাজার খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যদিও তা এখনও কার্যকরভাবে সফল হয়নি।
বিশ্বকাপেও ছাপ পড়ছে উত্তেজনার

বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজনেও এই অস্থিরতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। যৌথ আয়োজন হলেও তিন দেশের মধ্যে ঐক্যের প্রকাশ খুব একটা নেই। বরং আলাদা জাতীয় উপস্থিতিই বেশি দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু দেশের সমর্থকরা ম্যাচ দেখতে যেতে পারবে না। আবার অভিবাসন ইস্যুতে ভীতি তৈরি হওয়ায় অনেক দর্শক ও কর্মীর মধ্যেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অর্থনৈতিক বন্ধন এখনও টিকে আছে
সব উত্তেজনার মধ্যেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তিন দেশের মধ্যে বছরে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। উৎপাদন শৃঙ্খল এতটাই জটিল যে একটি পণ্য তৈরি হতে একাধিকবার সীমান্ত অতিক্রম করে। এমনকি নতুন প্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতা বাড়ছে। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে মেক্সিকো ও কানাডার গুরুত্ব এখনও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কমেনি।
ভবিষ্যৎ কী বলছে
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙবে না, তবে আগের মতো শক্তিশালীও থাকবে না। বাণিজ্য চুক্তি হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু তা হবে আরও দুর্বল ও শর্তসাপেক্ষ। বিশ্বকাপ হয়তো সাময়িক আনন্দ এনে দেবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উত্তর আমেরিকার ঐক্যের স্বপ্ন এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















