লাস ভেগাসের আকাশরেখায় জ্বলজ্বল করা বিশাল গোলাকার ভবনটি একসময় ছিল ঝুঁকিপূর্ণ এক স্বপ্ন। নির্মাণ ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল অস্বাভাবিকভাবে, সময়সূচি পিছিয়েছিল বছরের পর বছর, আর মহামারির ধাক্কায় পুরো লাইভ বিনোদন ব্যবসাই অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্ফিয়ার এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয় করা অ্যারেনা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গত বছর ১৭ লাখ টিকিট বিক্রি করে এ ভেন্যু আয় করেছে ৩৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
গত শনিবার রাতে ব্যান্ড ফিশ যখন “সিগমা ওয়েসিস” বাজাচ্ছিল, তখন ১৭ হাজার ৬০০ দর্শকের কাছে মনে হচ্ছিল তারা যেন একটি ডিমের ভেতরে আছে। পর্দার বিশাল ভিজ্যুয়ালে সেই খোলস ভাঙল, দর্শকরা যেন পাখির মতো জন্ম নিল এবং উড়তে শুরু করল। স্ফিয়ারের মূল আকর্ষণ এখানেই। এটি শুধু কনসার্ট হল নয়, বরং শব্দ, ছবি, আলো, স্থাপত্য ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে মিলিয়ে দর্শককে ভেতর থেকে ঘিরে ফেলে।
প্রথম দিকে অনেকেই ভেবেছিলেন, এত ব্যয়বহুল ভেন্যু ব্যবসায়িকভাবে টেকসই হবে না। ২০২৩ সালে স্ফিয়ার নির্মাণ শেষ হয় ২৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে, যা প্রাথমিক বাজেটের তুলনায় প্রায় ১০০ কোটি ডলার বেশি। এর পেছনের মানুষ জেমস ডোলান, যিনি নিউ ইয়র্ক নিক্স, রেঞ্জার্স ও ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের মতো ক্রীড়া ও বিনোদন সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত।
ঝুঁকি থেকে লাভের পথে
স্ফিয়ারের ধারণা শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে ডোলানের একটি সাধারণ স্কেচ থেকে। একটি বৃত্ত, তার ভেতরে একজন মানুষ। সেই ধারণা থেকেই তৈরি হয় এমন এক ভেন্যু, যা প্রচলিত কনসার্ট হলের ধারণাকে বদলে দিয়েছে। ২০১৮ সালে নির্মাণ শুরু হয় ১২০ কোটি ডলারের বাজেট নিয়ে। কিন্তু মাঝপথে কোভিড মহামারি এসে কাজ থামিয়ে দেয়। লাস ভেগাস স্ট্রিপের ক্যাসিনোগুলো বন্ধ হয়ে যায়, আর লাইভ বিনোদনের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
নির্মাণের সময় অনেকেই ভেন্যুটিকে বোঝাতে হিমশিম খেয়েছিলেন। কেউ একে বলেছিলেন উন্মাদনাপূর্ণ কনসার্ট ভেন্যু, কেউ বলেছিলেন এটি যেন দশ গুণ বড় প্ল্যানেটেরিয়াম। কিন্তু বড় প্রশ্ন ছিল, শিল্পীরা কি এত ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভর প্রযোজনায় বিনিয়োগ করতে রাজি হবেন? দর্শকেরা কি মরুভূমির শহরে এসে এমন শো দেখবে? আর বিশাল প্রযুক্তি কি মানুষের পারফরম্যান্সকে ছাপিয়ে যাবে?
স্ফিয়ার কর্তৃপক্ষ জানত, শুরুতেই দরকার বিশ্বজোড়া পরিচিতি আছে এমন একজন শিল্পী বা ব্যান্ড। সেই জায়গায় আসে ইউটু। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সক্রিয় আইরিশ রক ব্যান্ডটি প্রযুক্তিনির্ভর মঞ্চের জন্য আগে থেকেই পরিচিত ছিল। স্ফিয়ার পুরোপুরি তৈরি হওয়ার আগেই তারা উদ্বোধনী পারফরম্যান্সে রাজি হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া তাদের রেসিডেন্সি ৪০টি শো পর্যন্ত চলে এবং বড় সাফল্য পায়।
পুরোনো তারকা, নতুন প্রযুক্তি
স্ফিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক সূত্রটি এখন স্পষ্ট। প্রযুক্তি একেবারে নতুন, কিন্তু মঞ্চে থাকেন এমন শিল্পীরা, যাদের গান বহু দশক ধরে শ্রোতারা মুখস্থ জানেন। ইউটু, ঈগলস, কেনি চেসনি, ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, ফিশ, ডেড অ্যান্ড কোম্পানি, সামনে নো ডাউট, মেটালিকা ও কারিন লেওন। এই তালিকা দেখায়, স্ফিয়ার শুধু তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তি-কৌতূহল নয়, বরং পুরোনো অনুরাগীদের স্মৃতি ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যকেও কাজে লাগাচ্ছে।
এখানে রেসিডেন্সি শো দিন, সপ্তাহ বা মাসজুড়ে চলতে পারে। এতে শিল্পীরা এক শহরে থেকে বহু শো করতে পারেন, আর ব্যয়বহুল ভিজ্যুয়াল প্রযোজনার খরচ ধীরে ধীরে উঠে আসে। স্ফিয়ারের মতো ভেন্যুতে এক রাতের শো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতাই ব্যবসার ভিত্তি।
দিনের বেলাতেও স্ফিয়ার বসে থাকে না। কনসার্টের আগে দর্শকদের জন্য দেখানো হয় “দ্য উইজার্ড অব অজ”-এর পুনর্নির্মিত নিমজ্জিত সংস্করণ, যেখানে দর্শকের মনে হয় তারা যেন ডরোথির সঙ্গে হলুদ ইটের পথ ধরে হাঁটছে। এই অভিজ্ঞতার টিকিটের দামও প্রায় ২০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
চলচ্চিত্রের ভেতরে হাঁটার অভিজ্ঞতা
১৯৩৯ সালের ক্লাসিক চলচ্চিত্র “দ্য উইজার্ড অব অজ”কে স্ফিয়ারের জন্য নতুন করে তৈরি করতে জেমস ডোলান গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকৌশলীদের যুক্ত করেন। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ১০ কোটি ডলার। এক দৃশ্যে ওপর থেকে ফোমের তৈরি লাল আপেল পড়ে, টর্নেডোর সময় চারদিকে পাতা ঘোরে। দর্শক শুধু ছবি দেখে না, বরং ছবির ভেতরে অবস্থান করছে এমন অনুভূতি পায়।
গত ২৮ আগস্ট থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত এই চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা টিকিট বিক্রি থেকে ২৬ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে বলে কোম্পানি জানিয়েছে। এটি দেখায়, স্ফিয়ার শুধু কনসার্ট ভেন্যু নয়, বরং ভবিষ্যতের নিমজ্জিত বিনোদন ব্যবসার পরীক্ষাগার।
প্রতিটি শিল্পীও আগের শোকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। স্ফিয়ার এন্টারটেইনমেন্ট ও এমএসজি এন্টারটেইনমেন্টের লাইভ বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফিন ভ্যাকারেলোর ভাষায়, প্রতিষ্ঠানটি এখনো সম্ভাবনার শুরুতেই আছে। প্রতিটি নতুন প্রযোজনা আগেরটির চেয়ে বড়, বেশি কল্পনাপ্রবণ এবং বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হতে চাইছে।
মঞ্চ যখন রাইডের মতো
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সাইলেন্ট হাউসের প্রধান বাজ হ্যালপিন ঈগলস ও ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের স্ফিয়ার শো নির্মাণে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, স্থিরভাবে পারফর্ম করা ব্যান্ড এবং নাচ, পোশাক পরিবর্তন ও চলমান মঞ্চভঙ্গিতে অভ্যস্ত ব্যান্ডের প্রয়োজন ভিন্ন। ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের ক্ষেত্রে তিনি এমন ব্যবস্থা করেন, যাতে তারা লিফটে উঠে আকাশে ভাসছে বলে মনে হয়। লিফটের গতি ও পর্দার ভিজ্যুয়াল একই ছন্দে রাখা হয়, যেন দর্শকের কাছে তা মহাকাশযানের ভেতর দিয়ে উড়ে যাওয়ার অনুভূতি দেয়।
ফিশ তাদের সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত করেছে স্বপ্নময়, ঘোর লাগা অ্যানিমেশন। জ্যাক ব্রাউন ব্যান্ড দর্শকদের নিয়ে গেছে পানির নিচের এক অদ্ভুত জগতে, যেখানে ব্রাউন নিজের জীবনের গল্প বলেন। ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক তারকা ইলেনিয়াম তো স্ফিয়ারের রেসিডেন্সির কথা মাথায় রেখেই একটি অ্যালবাম রেকর্ড করেছেন, যাতে গান ও দৃশ্য একইসঙ্গে নির্মিত হয়।

বিলাসী টিকিট, বড় লাভ
স্ফিয়ার এন্টারটেইনমেন্ট গত বছর লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখেছে। আগের বছরের ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার লোকসানের পর প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৩৪ লাখ ডলার নিট আয় করেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যে শেয়ারের দাম ছিল ২৬ ডলার, তা বেড়ে ১২৯ ডলারে পৌঁছায়।
এখানে কনসার্ট টিকিটের দাম কয়েক শ ডলার থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সিটগিকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত স্ফিয়ার কনসার্টের গড় পুনর্বিক্রয় মূল্য ৫২১ ডলার, যা গত বছরের ৪১৫ ডলারের চেয়ে বেশি। ফিশের টিকিট গড়ে ৭৯৮ ডলার, ইউটু ৭৫৪ ডলার এবং ঈগলস ৬৩৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।
মেটালিকা যখন আগামী অক্টোবর থেকে স্ফিয়ারে রেসিডেন্সি ঘোষণা করে, অনেক অনুরাগী দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করেন। ব্যান্ডটি ২৪টি শো ঘোষণা করেছে এবং সবগুলোই বিক্রি হয়ে গেছে। সান ফ্রান্সিসকোর সঙ্গীতশিল্পী ও আইনজীবী জেফ স্টেইন দুটি রাতের জন্য ৬৩০ ডলারে টিকিট পেয়েছেন। তাঁর মতে, আইম্যাক্স ও ত্রিমাত্রিক চশমা একসময় যে অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, স্ফিয়ার যেন সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ রূপ।
লাস ভেগাসের সাফল্যের পর স্ফিয়ার এখন আবুধাবিতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় একটি ছোট স্ফিয়ার তৈরির পরিকল্পনা চলছে মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে, ওয়াশিংটন ডিসির কাছে। সেখানে আসন থাকবে প্রায় ছয় হাজার। আরও শহর খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডোলান প্রকাশ্যে বলেছেন, কোম্পানি একসঙ্গে পাঁচ বা ছয়টি প্রকল্প পরিচালনা করতে পারে এবং যত বেশি সম্ভব স্ফিয়ার তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।
স্ফিয়ারের গল্প তাই শুধু একটি ভেন্যুর নয়। এটি দেখাচ্ছে, পুরোনো সঙ্গীত, প্রজন্মজোড়া স্মৃতি, উচ্চমূল্যের অভিজ্ঞতা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলে লাইভ বিনোদনের নতুন অর্থনীতি তৈরি করছে।
লাস ভেগাসের স্ফিয়ার পুরোনো তারকা, নতুন প্রযুক্তি ও নিমজ্জিত অভিজ্ঞতায় বিশ্বের সবচেয়ে আয় করা অ্যারেনা হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















