০১:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
প্রদেশ নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই পাকিস্তানের প্রকৃত সংস্কার টাইটানিকের শতাধিক নিদর্শন নিলাম বন্ধ করলেন মার্কিন বিচারক আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন, এলসি ছাড়াই সীমাহীন মূল্যের চুক্তিতে পণ্য আমদানির সুযোগ মহেশখালীর সাগরে নিউজিল্যান্ডের পরিবারের নৌকাডুবি, নিখোঁজ কিশোর চীনের জে-১০ সিই কিনছে বাংলাদেশ ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ৯০৭; মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮৮ বুধবার বাংলাদেশে পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী, দেশজুড়ে নানা আয়োজন ঢাকা-যশোর রুটে আবার ইউএস-বাংলার ফ্লাইট, ৯ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন দুই ট্রিপ মেঘনা ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকার সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড অনুমোদন, মূলধন শক্তিশালী হবে প্রিন্স হ্যারি–মেগানের নতুন ব্রিটেনযাত্রা, পেছনে পড়ে থাকবে আর্চির প্রিয় ‘মুরগির বাড়ি’

সহিংসতা যখন মতাদর্শের ভাষা হয়ে ওঠে

রাজনীতিতে মতভেদ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রবণতা ক্রমশ চোখে পড়ছে, তা কেবল মতবিরোধের সীমা পেরিয়ে এক ধরনের নৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে। ছোটখাটো চুরি থেকে শুরু করে সহিংসতার প্রতি নরম মনোভাব—সবকিছুই এখন কিছু মানুষের কাছে রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে উঠছে। এর পেছনে যে যুক্তি হাজির করা হচ্ছে, তা আরও উদ্বেগজনক: অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ’।

কিছু বুদ্ধিজীবী ও জনপ্রিয় কণ্ঠ এখন দাবি করছেন, বড় কর্পোরেশনের কাছ থেকে চুরি করা নাকি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এমনকি এই কাজকে ‘প্রতিবাদ’ হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে। সমাজে বৈষম্য আছে—এটা সত্য। কিন্তু সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই কি আইনের সীমা ভেঙে? যখন নৈতিকতার জায়গা নেয় মতাদর্শ, তখন এই প্রশ্নগুলোই হারিয়ে যেতে থাকে।

এই প্রবণতা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সহিংস ঘটনার পরও সামাজিক মাধ্যমে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যেখানে অপরাধীকে নায়ক বানানো হয়, আর ভুক্তভোগীকে দায়ী করা হয়। এতে বোঝা যায়, সমাজের একাংশে সহিংসতার প্রতি সহানুভূতি তৈরি হচ্ছে। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের অবস্থান নয়—এটি একটি বৃহত্তর মানসিক পরিবর্তনের লক্ষণ।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূমিকা

এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে অনেক সময় এমন এক ধরনের চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে পশ্চিমা মূল্যবোধকে একপাক্ষিকভাবে দায়ী করা হয় এবং বিকল্প হিসেবে যে ধারণা তুলে ধরা হয়, তা প্রায়ই বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। তরুণদের একটি অংশ এই ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, যেখানে জটিল সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে সহিংসতা বা আইন ভাঙার যুক্তি হাজির করা হয়।

এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাজনৈতিক মূলধারার নেতারাও এই ভাষার কাছাকাছি অবস্থান নিতে শুরু করেন। প্রতিপক্ষকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা, তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেওয়া—এসবই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। এতে করে গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়, আর সহিংসতার সম্ভাবনা বাড়ে।

How Academia Abandoned Evidence for Ideology | Melanie Philips

নৈতিকতার অবক্ষয়

একসময় নৈতিকতা মানে ছিল কিছু মৌলিক নীতি—যা ব্যক্তি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই নৈতিকতা মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত অনুভূতি বা মতাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান নেওয়া। ফলে ধনী মানেই খারাপ, দরিদ্র মানেই নির্দোষ—এমন সরলীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং অন্যায়কে বৈধতা দেয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু মানুষ মনে করছেন যে পরিবেশ বা সামাজিক ন্যায়ের নামে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই যুক্তি যদি প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গণতন্ত্রের সামনে চ্যালেঞ্জ

গণতন্ত্র টিকে থাকে মানুষের আস্থার ওপর। কিন্তু যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে এই ব্যবস্থা তাদের জন্য কাজ করছে না, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজে। সেই বিকল্প যদি হয় সহিংসতা বা আইন ভাঙা, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

আজকের এই প্রবণতা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। মতাদর্শের নামে যদি নৈতিকতার জায়গা দখল হয়ে যায়, তাহলে সমাজের ভিত্তিই নড়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে যুক্তিবোধ, সংযম এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা। নইলে আমরা এমন এক পথে এগোবো, যেখানে মতভেদ আর সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রদেশ নয়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই পাকিস্তানের প্রকৃত সংস্কার

সহিংসতা যখন মতাদর্শের ভাষা হয়ে ওঠে

০৬:০১:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

রাজনীতিতে মতভেদ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রবণতা ক্রমশ চোখে পড়ছে, তা কেবল মতবিরোধের সীমা পেরিয়ে এক ধরনের নৈতিক বিপর্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করছে। ছোটখাটো চুরি থেকে শুরু করে সহিংসতার প্রতি নরম মনোভাব—সবকিছুই এখন কিছু মানুষের কাছে রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে উঠছে। এর পেছনে যে যুক্তি হাজির করা হচ্ছে, তা আরও উদ্বেগজনক: অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ’।

কিছু বুদ্ধিজীবী ও জনপ্রিয় কণ্ঠ এখন দাবি করছেন, বড় কর্পোরেশনের কাছ থেকে চুরি করা নাকি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এমনকি এই কাজকে ‘প্রতিবাদ’ হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে। সমাজে বৈষম্য আছে—এটা সত্য। কিন্তু সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই কি আইনের সীমা ভেঙে? যখন নৈতিকতার জায়গা নেয় মতাদর্শ, তখন এই প্রশ্নগুলোই হারিয়ে যেতে থাকে।

এই প্রবণতা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সহিংস ঘটনার পরও সামাজিক মাধ্যমে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যেখানে অপরাধীকে নায়ক বানানো হয়, আর ভুক্তভোগীকে দায়ী করা হয়। এতে বোঝা যায়, সমাজের একাংশে সহিংসতার প্রতি সহানুভূতি তৈরি হচ্ছে। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের অবস্থান নয়—এটি একটি বৃহত্তর মানসিক পরিবর্তনের লক্ষণ।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূমিকা

এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে অনেক সময় এমন এক ধরনের চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে পশ্চিমা মূল্যবোধকে একপাক্ষিকভাবে দায়ী করা হয় এবং বিকল্প হিসেবে যে ধারণা তুলে ধরা হয়, তা প্রায়ই বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। তরুণদের একটি অংশ এই ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, যেখানে জটিল সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে সহিংসতা বা আইন ভাঙার যুক্তি হাজির করা হয়।

এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাজনৈতিক মূলধারার নেতারাও এই ভাষার কাছাকাছি অবস্থান নিতে শুরু করেন। প্রতিপক্ষকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা, তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেওয়া—এসবই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। এতে করে গণতান্ত্রিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়, আর সহিংসতার সম্ভাবনা বাড়ে।

How Academia Abandoned Evidence for Ideology | Melanie Philips

নৈতিকতার অবক্ষয়

একসময় নৈতিকতা মানে ছিল কিছু মৌলিক নীতি—যা ব্যক্তি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই নৈতিকতা মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত অনুভূতি বা মতাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান নেওয়া। ফলে ধনী মানেই খারাপ, দরিদ্র মানেই নির্দোষ—এমন সরলীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতাকে বিকৃত করে এবং অন্যায়কে বৈধতা দেয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু মানুষ মনে করছেন যে পরিবেশ বা সামাজিক ন্যায়ের নামে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই যুক্তি যদি প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গণতন্ত্রের সামনে চ্যালেঞ্জ

গণতন্ত্র টিকে থাকে মানুষের আস্থার ওপর। কিন্তু যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে এই ব্যবস্থা তাদের জন্য কাজ করছে না, তখন তারা বিকল্প পথ খোঁজে। সেই বিকল্প যদি হয় সহিংসতা বা আইন ভাঙা, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

আজকের এই প্রবণতা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। মতাদর্শের নামে যদি নৈতিকতার জায়গা দখল হয়ে যায়, তাহলে সমাজের ভিত্তিই নড়ে যেতে পারে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে যুক্তিবোধ, সংযম এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনা। নইলে আমরা এমন এক পথে এগোবো, যেখানে মতভেদ আর সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।