সিঙ্গাপুর—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এখন এশিয়ার অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক অঞ্চল হিসেবে এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিতে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক উন্নয়নশীল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে এ বছর ৪.৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪.৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যেখানে আগে তা ছিল ৫.১ শতাংশ। একই সঙ্গে চলতি বছরের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৫.২ শতাংশ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এপ্রিল মাসে এশিয়ার তেল আমদানি বছরে ৩০ শতাংশ কমে গেছে, যা ২০১৫ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। এই প্রণালী বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় এর ব্যাঘাত সরাসরি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দেশে সরকারগুলো ভর্তুকি ও করছাড় দিয়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে, যার ফলে আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক ধাক্কা মোকাবিলায় সরকারগুলো জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ানো বা কর কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। এতে সাধারণ ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও সরকারি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
ভারতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পরিশোধন খাত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলেও দেশীয় জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রেখেছে। এতে ডিজেলে প্রতি লিটারে প্রায় ১০০ রুপি এবং পেট্রোলে ২০ রুপি পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। তবে রাজ্য নির্বাচন শেষ হওয়ায় শিগগিরই দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করেছে, মজুতদারি রোধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং রপ্তানি কমিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
চীন, বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ, বড় মজুত, বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কিছুটা সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে। তবে তারা কিছু আঞ্চলিক দেশের জন্য বিশেষ সুবিধাও দিচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, সরকারগুলো আর্থিক সংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং তেলের মজুত ব্যবহার করায় যুদ্ধের প্রভাব আশঙ্কার তুলনায় কিছুটা কম হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

মুদ্রাবাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলো ডলারের বিপরীতে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর ফিলিপাইনের পেসো ৫ শতাংশের বেশি, থাইল্যান্ডের বাত ও ভারতের রুপি ৩ শতাংশের বেশি এবং ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহ ২.৫ শতাংশের বেশি কমেছে।
অন্যদিকে চীনের ইউয়ান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং জাপানের সরকারি হস্তক্ষেপে ইয়েনও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে।
পাকিস্তান ইতোমধ্যে দীর্ঘ বিরতির পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। কাতার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
এই দেশগুলো নিজেদের জ্বালানি খাতকে টিকিয়ে রাখতে বিপুল ভর্তুকি দিচ্ছে, ফলে তাদের আর্থিক সুরক্ষা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দেশের আর্থিক সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তারা এই সংকটে দ্রুত চাপে পড়ছে।

তবে ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার সংকটের তুলনায় এশিয়ার দেশগুলো এখন কিছুটা ভালো প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে ইন্দোনেশিয়া নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে রপ্তানির চেয়ে দেশীয় বাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং নতুন উৎস থেকে তেল আমদানির পরিকল্পনা করছে। থাইল্যান্ডে উচ্চ দাম ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কারণে জ্বালানির চাহিদা কমে গেছে।
জাপান, যা তার প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে তেল কিনছে। একই সঙ্গে তারা মজুত থেকে তেল ছাড়াও শুরু করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর দ্বিতীয়বারের মতো এমন পদক্ষেপ।
টনি মনরো, ফ্লোরেন্স টান 



















