দেশের অন্যতম ধান উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় এবার বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। মাঠে ফলন ভালো হলেও বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক এবার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে নওগাঁর ১১টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ২০ হাজার টন ধান, যা থেকে প্রায় ৮ লাখ ৮০ হাজার টন চাল উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ধান কাটা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন কৃষকরা।
তবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ কৃষকরা। বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়, যেখানে গত বছর একই সময়ে দাম ছিল অন্তত এক হাজার ৪০০ টাকা।

উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম
রাণীনগর উপজেলার বিজয়কান্দি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও ধান বিক্রি করে তিনি পাচ্ছেন মাত্র ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক কৃষকের মতো তিনিও লিজ নেওয়া জমিতে চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমির জন্য বছরে প্রায় ১৪ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সেচ, সার, কীটনাশক, ধান কাটা ও মাড়াই—সব মিলিয়ে এবার উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে।
একই এলাকার কৃষক বিপথ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। বাধ্য হয়ে ভেজা ধান কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, কৃষিকাজের জন্য নেওয়া ঋণের চাপও বাড়ছে। পাওনাদারদের চাপের কারণে অনেকেই ধান ধরে রাখতে পারছেন না। কিছুদিন অপেক্ষা করে শুকনো ধান বিক্রি করতে পারলে হয়তো ভালো দাম পাওয়া যেত।
কৃষকদের দাবি, অন্তত প্রতি মণ ধানের দাম এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা হলে তারা খরচ তুলতে পারবেন।

বাজারে ভেজা ধানের চাপ
নওগাঁর আবাদপুকুর হাট, লোহাচুরা হাট ও আহসানগঞ্জ হাট ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বিপুল পরিমাণ ভেজা ধান আসছে। এতে সরবরাহ বেড়ে গেলেও ক্রেতা তুলনামূলক কম থাকায় দাম আরও কমে যাচ্ছে।
ধান ব্যবসায়ী এনামুল হক জানান, বাজারে যে ধান আসছে তার বেশিরভাগই ভেজা। মানভেদে মঙ্গলবার প্রতি মণ ধান এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, আগের মৌসুমের অনেক ধান এখনও গুদামে মজুত রয়েছে। ফলে নতুন ধান কেনার আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফারহাদ হোসেন চাকদার বলেন, অতিরিক্ত আমদানির কারণেও বাজারে প্রভাব পড়েছে। আগের মজুত ধান বিক্রি না হওয়ায় বড় ব্যবসায়ীরা তারল্য সংকটে রয়েছেন। ফলে বাজারে সক্রিয় ক্রেতা কমে গেছে।
তিনি দ্রুত সরকারি ধান সংগ্রহ শুরু এবং খাদ্য গুদাম খালি করার আহ্বান জানান। তার মতে, সরকার যদি প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকায় কিনে, তাহলে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

আশার কথা বলছে কৃষি বিভাগ
তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে ভেজা ধান বাজারে আসায় দাম কমেছে। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মন্ডল জানান, মৌসুমের মূল ধান ওঠা শুরু হলে এবং শুকনো ধান বাজারে এলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারি ধান সংগ্রহ শুরু হলে কৃষকরা আরও ভালো দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর ধান কাটার মৌসুমে একই ধরনের মূল্যপতনের ঘটনা ঘটছে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এবং কৃষি প্রণোদনা না বাড়ালে প্রান্তিক কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















