বিশ্বজুড়ে টেলিভিশন সংবাদ ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া গণমাধ্যম উদ্যোক্তা টেড টার্নার মারা গেছেন। সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত এই প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বুধবার ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। টার্নার এন্টারপ্রাইজেসের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে সিএনএন।
বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল হিসেবে ১৯৮০ সালে সিএনএন চালু করে সংবাদ সম্প্রচারের ধরণই বদলে দেন টেড টার্নার। এর আগে দর্শকদের নির্দিষ্ট সময়ের সংবাদ বুলেটিনের ওপর নির্ভর করতে হলেও সিএনএনের মাধ্যমে যেকোনো সময় খবর দেখার সুযোগ তৈরি হয়। আধুনিক টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিকাশে এই উদ্যোগকে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে ধরা হয়।
সংবাদ সম্প্রচারে নতুন যুগ
টেড টার্নারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয় ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সিএনএনের সরাসরি সম্প্রচার। যুদ্ধ চলাকালে বাগদাদ থেকে লাইভ সম্প্রচার করে সিএনএন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রচারের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে এই কাভারেজ।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদকে দ্রুত, ধারাবাহিক এবং বৈশ্বিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে টার্নারের ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। তার উদ্যোগ পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্প্রচার কৌশলেও বড় পরিবর্তন আনে।
বিলবোর্ড ব্যবসা থেকে মিডিয়া সাম্রাজ্য
নিজের বাবার বিলবোর্ড ব্যবসা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন টেড টার্নার। পরে সেই ব্যবসাকে বিস্তৃত করে তিনি গড়ে তোলেন টার্নার ব্রডকাস্টিং সিস্টেম। সময়ের সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৯৬ সালে টার্নার ব্রডকাস্টিং সিস্টেমকে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে টাইম ওয়ার্নারের কাছে বিক্রি করেন তিনি। তখন প্রতিষ্ঠানটির অধীনে একাধিক কেবল নেটওয়ার্ক, ক্রীড়া দল এবং চলচ্চিত্র স্টুডিও ছিল।
তবে প্রতিষ্ঠান বিক্রির পরও প্রভাব বজায় থাকবে বলে আশা করলেও ধীরে ধীরে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যান। পরবর্তী সময়ে এটিকে নিজের জীবনের বড় ভুলগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছিলেন টার্নার।
বিতর্কিত কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব
খোলামেলা বক্তব্য এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার জন্য টেড টার্নার ছিলেন বহুল আলোচিত। “ক্যাপ্টেন আউটরেজিয়াস” ও “দ্য মাউথ অব দ্য সাউথ” নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। অভিনেত্রী জেন ফন্ডার সঙ্গে তার বিয়ে নিয়েও দীর্ঘ সময় গণমাধ্যমে আলোচনা ছিল।

গণমাধ্যমের বাইরেও নানা ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন টার্নার। তিনি আটলান্টার পেশাদার ক্রীড়া দলগুলোর মালিক ছিলেন এবং ১৯৭৭ সালে আমেরিকাস কাপ প্রতিযোগিতায় জয়ও পান। পাশাপাশি জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ১ বিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়ে মানবিক কাজেও আলোচিত হন।
জীবনের শেষ সময়ে তিনি লিউই বডি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হন। এরপর জনজীবন থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে দাতব্য কাজ এবং নিজের বিশাল ভূমি সম্পত্তির দেখভালে মনোযোগ দেন। তার মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল ২০ লাখ একরের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাইসন পালও ছিল তার নিয়ন্ত্রণে।
একটি সংবাদবিপ্লবের উত্তরাধিকার
টেড টার্নারের মৃত্যুতে শুধু একজন উদ্যোক্তার নয়, বরং আধুনিক ২৪ ঘণ্টার সংবাদযুগের একজন নির্মাতার বিদায় ঘটল। তার প্রতিষ্ঠিত সিএনএন বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের ধারা বদলে দিয়ে টেলিভিশন সাংবাদিকতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার ৮৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। আধুনিক ২৪ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচারের পথিকৃৎ হিসেবে বদলে দেন বিশ্ব গণমাধ্যমের ধারা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















