০৩:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
এআই অবকাঠামো নিয়ে জনরোষ: প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জাপানি কোম্পানির বিরল খনিজ আমদানি ব্যয় ২২% বেড়েছে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে চাপ এআই একচেটিয়া হতে পারে না, বিশ্বজুড়ে সহযোগিতার আহ্বান শি জিনপিংয়ের এফবিআইর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার গ্যাং সদস্য নিতিশ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯% কমেছে, দামে ও পরিমাণে একসঙ্গে ধাক্কা বিশ্বকাপের শেষ বাঁশির পর: ফুটবল যে আয়নায় আমেরিকা ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ দেখা গেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা

কলকাতার পুনর্জন্ম কি সত্যিই সম্ভব?

একসময় কলকাতা ছিল শুধু একটি শহর নয়, ভারতের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রের আরেক নাম। হাওড়া শিল্পাঞ্চলকে বলা হতো ‘এশিয়ার শেফিল্ড’। হুগলি নদীর দুই তীরে জুটমিল, প্রকৌশল কারখানা, ট্রেডিং হাউস আর বন্দরনির্ভর ব্যবসা মিলে যে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা শুধু বাংলাকে নয়, পুরো ভারতকে এগিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—একটি শহর বা রাজ্যের পতন কখনও হঠাৎ ঘটে না। তা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক ভুলনীতির সম্মিলিত ফল।

আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে যে ক্ষোভ, তা কেবল নির্বাচনী পালাবদলের প্রশ্ন নয়। এটি মূলত একটি দীর্ঘ হতাশার বিস্ফোরণ। কয়েক দশক ধরে বাংলার ভোটার যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন, সেখানে রাজনৈতিক দল বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায়নি—এমন অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হয়েছে।

বাম আমলের উত্তরাধিকার ও নতুন ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর শুরুতে ভূমি সংস্কার ও গ্রামীণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন ভাষ্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কাঠামোই এক ধরনের দলনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রূপ নেয়। ব্যবসা, পরিবহণ, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা গ্রামীণ উন্নয়ন—সবখানেই রাজনৈতিক আনুগত্য যেন হয়ে ওঠে প্রধান শর্ত। শিল্পপতিরা একে একে রাজ্য ছাড়তে শুরু করেন। কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে কলকাতার আকর্ষণ কমতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এলেও সমালোচকদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সংস্কৃতির মূল চরিত্র বদলায়নি। বরং নতুন রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই অন্য রূপে টিকে গেছে। শিল্প বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, দুর্নীতির অভিযোগ, শিক্ষা নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং স্থানীয় স্তরে দলীয় প্রভাব—এসব প্রশ্ন জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সুনিশ্চিত হোক নারীর নিরাপত্তা

নারী নিরাপত্তা ও জনবিশ্বাসের সংকট

গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে নারী নির্যাতন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক হত্যাকাণ্ড কিংবা সন্দেশখালির ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া শুধু বিচারের দাবি ছিল না; তা ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ।

বিশেষ করে যখন অভিযোগ ওঠে যে প্রশাসন প্রথম থেকেই নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়নি, তখন মানুষের আস্থার সংকট আরও তীব্র হয়। আদালত, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা কিংবা রাস্তায় আন্দোলন—সব মিলিয়ে বাংলার নাগরিক সমাজ যেন বারবার বলতে চেয়েছে, তারা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা হারাচ্ছে।

শিক্ষা ও দুর্নীতির রাজনীতি

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অভিঘাত তৈরি করেছে। হাজার হাজার চাকরি বাতিল হওয়ার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েছে, তারা দেখেছে চাকরি যেন মেধার বদলে টাকার বিনিময়ে বণ্টিত হচ্ছে—এমন ধারণা জনমনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

একইসঙ্গে রেশন দুর্নীতি বা আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ সাধারণ ভোটারের মনে এই প্রশ্ন জোরদার করেছে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা কি ক্রমশ জনসেবার বদলে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যন্ত্র হয়ে উঠছে?

তবু বাংলার সামনে সুযোগ আছে

তবে পশ্চিমবঙ্গের সংকটের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—বাংলা কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

ইতিহাস বলে, এই ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি গভীর। ভারতের আধুনিক প্রশাসন, শিল্প, সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদী চিন্তার অনেক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এই বাংলায়। তাই বাংলার পতন যেমন দীর্ঘমেয়াদি ছিল, তার পুনরুদ্ধারও একদিনে সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস পুনর্গঠন—এই চারটি জায়গায় যদি সত্যিকারের পরিবর্তন আসে, তবে কলকাতা আবারও নতুন যাত্রা শুরু করতে পারে।

ভোটার আসলে খুব জটিল কিছু চাননি। তারা চেয়েছেন নিরাপত্তা, সম্মানজনক কাজ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সাধারণ নাগরিককে প্রতিদিন দলীয় প্রভাবের সঙ্গে আপস করে বাঁচতে না হয়। বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সহজ অথচ মৌলিক দাবিগুলোর উত্তর কত দ্রুত এবং কত আন্তরিকভাবে দেওয়া যায় তার ওপর।

জনপ্রিয় সংবাদ

এআই অবকাঠামো নিয়ে জনরোষ: প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

কলকাতার পুনর্জন্ম কি সত্যিই সম্ভব?

০৮:০৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

একসময় কলকাতা ছিল শুধু একটি শহর নয়, ভারতের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রের আরেক নাম। হাওড়া শিল্পাঞ্চলকে বলা হতো ‘এশিয়ার শেফিল্ড’। হুগলি নদীর দুই তীরে জুটমিল, প্রকৌশল কারখানা, ট্রেডিং হাউস আর বন্দরনির্ভর ব্যবসা মিলে যে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা শুধু বাংলাকে নয়, পুরো ভারতকে এগিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো—একটি শহর বা রাজ্যের পতন কখনও হঠাৎ ঘটে না। তা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক ভুলনীতির সম্মিলিত ফল।

আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে যে ক্ষোভ, তা কেবল নির্বাচনী পালাবদলের প্রশ্ন নয়। এটি মূলত একটি দীর্ঘ হতাশার বিস্ফোরণ। কয়েক দশক ধরে বাংলার ভোটার যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন, সেখানে রাজনৈতিক দল বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায়নি—এমন অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হয়েছে।

বাম আমলের উত্তরাধিকার ও নতুন ক্ষমতার পুনরাবৃত্তি

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর শুরুতে ভূমি সংস্কার ও গ্রামীণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নতুন ভাষ্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কাঠামোই এক ধরনের দলনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রূপ নেয়। ব্যবসা, পরিবহণ, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা গ্রামীণ উন্নয়ন—সবখানেই রাজনৈতিক আনুগত্য যেন হয়ে ওঠে প্রধান শর্ত। শিল্পপতিরা একে একে রাজ্য ছাড়তে শুরু করেন। কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে কলকাতার আকর্ষণ কমতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ‘পরিবর্তন’-এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এলেও সমালোচকদের অভিযোগ, প্রশাসনিক সংস্কৃতির মূল চরিত্র বদলায়নি। বরং নতুন রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই অন্য রূপে টিকে গেছে। শিল্প বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, দুর্নীতির অভিযোগ, শিক্ষা নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং স্থানীয় স্তরে দলীয় প্রভাব—এসব প্রশ্ন জনমনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সুনিশ্চিত হোক নারীর নিরাপত্তা

নারী নিরাপত্তা ও জনবিশ্বাসের সংকট

গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে নারী নির্যাতন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক হত্যাকাণ্ড কিংবা সন্দেশখালির ঘটনায় সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া শুধু বিচারের দাবি ছিল না; তা ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রকাশ।

বিশেষ করে যখন অভিযোগ ওঠে যে প্রশাসন প্রথম থেকেই নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়নি, তখন মানুষের আস্থার সংকট আরও তীব্র হয়। আদালত, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা কিংবা রাস্তায় আন্দোলন—সব মিলিয়ে বাংলার নাগরিক সমাজ যেন বারবার বলতে চেয়েছে, তারা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা হারাচ্ছে।

শিক্ষা ও দুর্নীতির রাজনীতি

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অভিঘাত তৈরি করেছে। হাজার হাজার চাকরি বাতিল হওয়ার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েছে, তারা দেখেছে চাকরি যেন মেধার বদলে টাকার বিনিময়ে বণ্টিত হচ্ছে—এমন ধারণা জনমনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

একইসঙ্গে রেশন দুর্নীতি বা আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ সাধারণ ভোটারের মনে এই প্রশ্ন জোরদার করেছে যে, রাজনৈতিক ক্ষমতা কি ক্রমশ জনসেবার বদলে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যন্ত্র হয়ে উঠছে?

তবু বাংলার সামনে সুযোগ আছে

তবে পশ্চিমবঙ্গের সংকটের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—বাংলা কি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

ইতিহাস বলে, এই ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি গভীর। ভারতের আধুনিক প্রশাসন, শিল্প, সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদী চিন্তার অনেক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এই বাংলায়। তাই বাংলার পতন যেমন দীর্ঘমেয়াদি ছিল, তার পুনরুদ্ধারও একদিনে সম্ভব নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাস পুনর্গঠন—এই চারটি জায়গায় যদি সত্যিকারের পরিবর্তন আসে, তবে কলকাতা আবারও নতুন যাত্রা শুরু করতে পারে।

ভোটার আসলে খুব জটিল কিছু চাননি। তারা চেয়েছেন নিরাপত্তা, সম্মানজনক কাজ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সাধারণ নাগরিককে প্রতিদিন দলীয় প্রভাবের সঙ্গে আপস করে বাঁচতে না হয়। বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সহজ অথচ মৌলিক দাবিগুলোর উত্তর কত দ্রুত এবং কত আন্তরিকভাবে দেওয়া যায় তার ওপর।