সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজে আলোচনা শুরু হয় সাধারণত মায়ের গর্ভধারণের পর থেকে। কী খাবেন, কতটা বিশ্রাম নেবেন, কোন হাসপাতালে যাবেন—সবকিছু ঘিরেই থাকে মাকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতিও বহু দশক ধরে একই পথে এগিয়েছে। মাতৃমৃত্যু কমানো, নবজাতকের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা, শিশুমৃত্যু হ্রাস—এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধীরে ধীরে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসছে: শুধু বেঁচে থাকাই কি যথেষ্ট, নাকি পরবর্তী প্রজন্ম কতটা সুস্থ, শক্তিশালী ও জৈবিকভাবে সক্ষম হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আধুনিক জীববিজ্ঞান পুরোনো একটি ধারণাকে নতুন করে পর্যালোচনা করছে। এতদিন ধরে ধরে নেওয়া হতো, সন্তানের মধ্যে বাবার ভূমিকা মূলত জিনগত উপাদান সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ শুক্রাণু কেবল ডিএনএ বহন করে নিয়ে যায়; বাবার খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, দূষণের মধ্যে বসবাস, ব্যায়ামের অভ্যাস কিংবা মাদকাসক্তি—এসবের কোনও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে না। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা সেই ধারণাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞান এখন বলছে, বাবার জীবনযাপনও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীর ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি গর্ভধারণের বহু আগেই একজন পুরুষের শরীরে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সন্তানের শরীরে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি শুধু জিনগত উত্তরাধিকারের প্রশ্ন নয়; বরং জিন কীভাবে কাজ করবে, কোন বৈশিষ্ট্য সক্রিয় হবে আর কোনটি নিস্ক্রিয় থাকবে—সেই নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও এটি জড়িত।

এই নতুন বোঝাপড়ার কেন্দ্রে রয়েছে ‘এপিজেনেটিকস’ নামে পরিচিত একটি ধারণা। এখানে ডিএনএ বদলায় না, কিন্তু ডিএনএর আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী অণুগুলো পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে শুক্রাণুর মধ্যে থাকা ক্ষুদ্র আরএনএ অণুগুলো এখন গবেষণার মূল আকর্ষণ। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, বাবার শরীরের অভিজ্ঞতা—যেমন নিয়মিত ব্যায়াম, অপুষ্টি, অতিরিক্ত মদ্যপান বা দূষণের সংস্পর্শ—এসব তথ্য কোনও না কোনওভাবে এই আরএনএ অণুর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে যেতে পারে।
সম্প্রতি চীনের একদল গবেষকের প্রকাশিত একটি গবেষণা এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। সেখানে দেখা গেছে, নিয়মিত ব্যায়াম করা পুরুষ ইঁদুরের সন্তানরা তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল, শক্তিশালী এবং বিপাকীয়ভাবে বেশি কার্যকর। শুধু তাই নয়, গবেষকেরা দেখেছেন যে ব্যায়ামের কারণে বাবার শুক্রাণুর ক্ষুদ্র আরএনএ অণুগুলোর গঠন বদলে গেছে, এবং সেই পরিবর্তন ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশে প্রভাব ফেলেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে উত্তরাধিকার মানে শুধু জিনের অনুলিপি নয়; বরং জীবনযাপনের সংকেতও ভবিষ্যতের শরীরে বহন হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ একজন বাবার শরীর তার সন্তানের শরীরের জন্য এক ধরনের ‘জৈবিক বার্তা’ তৈরি করছে।
অবশ্য এই গবেষণাগুলোর সীমাবদ্ধতাও আছে। অধিকাংশ গবেষণা এখনও প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রভাব কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবু প্রবণতাটি এতটাই শক্তিশালী যে একে আর উপেক্ষা করা কঠিন। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে বিপাকীয় সমস্যা, স্থূলতা, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আচরণগত জটিলতা বাড়ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, জনস্বাস্থ্যনীতি এখনও এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রজননস্বাস্থ্য মানেই এখনও মূলত মাতৃস্বাস্থ্য। পুরুষদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থেকে গেছে আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি বা পারিবারিক সহায়তায়। তাদের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক স্বাস্থ্য, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, পরিবেশগত ঝুঁকি কিংবা শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে কোনও সংগঠিত আলোচনা নেই।
এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত শূন্যতা। যদি সত্যিই বাবার জীবনযাপন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীরকে প্রভাবিত করে, তাহলে প্রজননস্বাস্থ্যকে আর শুধু নারীকেন্দ্রিক রাখার সুযোগ নেই। সন্তান জন্মের প্রস্তুতি কেবল মায়ের শরীরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দুইজন মানুষের যৌথ জৈবিক প্রস্তুতি।
সম্ভবত আগামী দশকের জনস্বাস্থ্যচিন্তায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হবে এই উপলব্ধি—একজন বাবা সন্তানের জীবনে শুধু সামাজিক উপস্থিতি নন, তিনি জৈবিক ভবিষ্যতেরও সক্রিয় নির্মাতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















