বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং আবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন বেইজিংয়ে। তবে এবারের বৈঠক ঘিরে আগের মতো বড় কোনও বাণিজ্য চুক্তি বা সম্পর্কের নাটকীয় উন্নতির আশা দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাত এড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মূল আলোচনায় থাকবে বাণিজ্য যুদ্ধ, শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, বিরল খনিজ রপ্তানি এবং দুই দেশের ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস।
বাণিজ্য যুদ্ধের পর সতর্ক সম্পর্ক

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। চীনা পণ্যের ওপর আমেরিকার শুল্ক বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৫ শতাংশে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিরল খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে বেইজিং, যা বিশ্ব শিল্পখাতে উদ্বেগ তৈরি করে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে দুই দেশ একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছায়। সেই চুক্তির আওতায় উভয় দেশ কিছু শুল্ক কমায় এবং চীন আবার বিরল খনিজ রপ্তানি শুরু করে। সেই সমঝোতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বৈঠকের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বড় চুক্তির স্বপ্ন ভেঙে গেছে
কয়েক মাস আগেও ধারণা করা হচ্ছিল, ট্রাম্প ও শি হয়তো একটি বড় অর্থনৈতিক সমঝোতার পথে এগোতে পারেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে চীনের বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল। কিন্তু এখন দুই পক্ষই বুঝতে পারছে, পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে দীর্ঘমেয়াদি বড় কোনও সমঝোতা বাস্তবসম্মত নয়।
চীনের নীতিনির্ধারণী মহলে এখন বিশ্বাস করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমস্যাগুলো কাঠামোগত এবং দীর্ঘমেয়াদি। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও বুঝে গেছে, চীনের অর্থনৈতিক মডেল বদলানো সম্ভব নয়। ফলে দুই দেশ এখন সীমিত কিছু বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি নিয়েই আলোচনা চালাতে আগ্রহী।
নতুন ‘বোর্ড অব ট্রেড’ নিয়ে আলোচনা

এই বৈঠকের বড় ঘোষণাগুলোর একটি হতে পারে একটি নতুন “বোর্ড অব ট্রেড” গঠন। এর মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক বিরোধ নিয়ন্ত্রণ এবং কোন পণ্য বাণিজ্যে থাকবে, তা নিয়ে সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনা নিয়েও সংশয় রয়েছে। কারণ চীনের সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি এখনও বিশাল। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, চীন অতিরিক্ত উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্ববাজার দখল করছে। অন্যদিকে চীন অভিযোগ করছে, আমেরিকা অতিরিক্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখিয়ে নানা পণ্যের ওপর বাধা দিচ্ছে।
এদিকে চীনের বাজারে মার্কিন পণ্যের চাহিদাও সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, গরুর মাংস, সয়াবিন এবং বোয়িং বিমান ছাড়া বড় পরিসরে মার্কিন পণ্যের চাহিদা খুব বেশি নেই।
শুল্ক ও প্রযুক্তি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ কিছু বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল করে দেওয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর পর যুক্তরাষ্ট্র নতুনভাবে তদন্ত শুরু করেছে, যার লক্ষ্য মূলত চীনের অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা ও জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ।
এই তদন্তের ফল যদি আবারও বড় শুল্কে গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে চীনও পাল্টা কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। দেশটি সম্প্রতি এমন কিছু নির্দেশনা জারি করেছে, যার মাধ্যমে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা অনুসরণকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসা পরিচালনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমঝোতা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সমঝোতা বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দুই দেশই জানে, পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। একই সঙ্গে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে আমেরিকাও বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব কমানোর পথ খুঁজছে।
তারপরও দুই দেশ আপাতত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্রহী। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর আরও কয়েকবার ট্রাম্প ও শি বৈঠক করবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা এবং কিছু বড় বাণিজ্যিক চুক্তিও সামনে আসতে পারে।
তবে সামগ্রিকভাবে প্রত্যাশা খুবই কম। এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে—সম্পর্ক যেন আরও খারাপ না হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















