ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের ফলে বিজেপির হাতে প্রায় গোটা পূর্ব ভারতের ক্ষমতা৷ এর কী প্রভাব পড়বে রাজনীতিতে৷
অঙ্গ-কলিঙ্গ অর্থাৎ বিহার ও ওড়িশা জয়ের পরে বিজেপির লক্ষ্য ছিল বঙ্গ বিজয়৷ এবারের বিধানসভা নির্বাচনে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে৷ এর ফলে জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির আধিপত্য আরো বেড়েছে৷ সীমান্তবর্তী রাজ্যে তাদের ক্ষমতা দখলের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে৷
বিজেপির প্রভাব বৃদ্ধি
ভারতীয় মানচিত্রের একেবারে ওপর ও নীচের অংশটুকু বাদ দিলে বাকি সব জায়গা গেরুয়া রঙে ঢেকে গিয়েছে৷ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে বিজেপি এখন ২২টি অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায়৷
প্রথমে তারা গোবলয়ের দল হিসেবে পরিচিত ছিল৷ উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র শাসন করে বিজেপি পূর্ব ভারতেও থাবা বসিয়েছে৷ ঝাড়খণ্ড ছাড়া বাকি সব রাজ্য তাদের দখলে৷ ২২টি রাজ্যের মধ্যে ১৬টিতে এককভাবে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি৷ বাকি ছটিতে তারা চালাচ্ছে জোট সরকার৷
উত্তরের দিল্লি থেকে পশ্চিমে রাজস্থান, উত্তর-পূর্বের মেঘালয় থেকে দক্ষিণের অন্ধ্রপ্রদেশে এখন বিজেপির শাসন৷ ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এই বিস্তারের গতি বেড়েছে৷ সেই সময় মাত্র সাতটি রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি৷ সে বছর ভারতের ৩৪ শতাংশ এলাকা ও ২৫ শতাংশ জনসমষ্টি বিজেপি শাসনের অধীনে ছিল৷ এখন গেরুয়া ব্রিগেডের হাতে ভারতের প্রায় তিন চতুর্থাংশের শাসন ক্ষমতা৷ এসব রাজ্যের জনসংখ্যা দেশের জনসমষ্টির ৭৮ শতাংশ৷
এই পর্যায়ে বিজেপির কাছে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন৷ তাদের আসনসংখ্যা ৩০৩ থেকে কমে হয় ২৪০৷ দুই বছরের মধ্যে সেই ধাক্কা অনেকটা সামলে নিতে পারল বিজেপি, যার প্রধান কারণ তাদের বহু প্রতীক্ষিত বঙ্গ বিজয়৷
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান
বামশাসিত পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ছিল একটি প্রান্তিক শক্তি৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যে এই দলের কোনো জায়গা ছিল না৷ ১৯৯১ সালে কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রে অভিনেতা ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্ম প্রতীকে প্রার্থী হয়েছিলেন৷ তার তারকা পরিচিতির সৌজন্যে বিজেপি সম্পর্কে জনমনে ধারণা গড়ে ওঠে৷ রাম জন্মভূমি আন্দোলনের হাওয়ায় ভিক্টর ২০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন৷
১৯৯৮ সালে লোকসভা নির্বাচনে প্রথম জয় পায় বিজেপি৷ তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে দমদমে জেতেন তপন সিকদার৷ কেন্দ্রে বাজপেয়ী সরকারের মন্ত্রী হন৷ কিন্তু রাজ্য রাজনীতিতে একেবারেই দাঁত ফোটাতে পারেনি গেরুয়া শিবির৷ ২০১৬ সালের নির্বাচনে তারা তিনটি আসনে জেতে ১০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে৷ এরপরই দ্রুতগতিতে উত্থান শুরু হয়৷
সেই বিধানসভা নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস জোটের হারের পর ধীরে ধীরে তৃণমূল বিরোধী ভোট সরে যায় বিজেপির দিকে৷ এর পরিণতিতে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ৩৮ শতাংশ ভোট নিয়ে ৭৭টি আসনে জয় পায় বিজেপি৷ সেখান থেকে অবিশ্বাস্য উত্থানে তারা ২০৭টি আসনে পৌঁছে গিয়েছে৷ প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৬ শতাংশ৷
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘শ্যামাপ্রসাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ পাকিস্তানে চলে যায়নি৷ তার রাজ্যে বিজেপির জয়ে একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো৷ সীমান্তবর্তী এলাকা হিসেবে এই রাজ্যে তাদের জয় তাৎপর্যপূর্ণ৷ উত্তর-পূর্বের সেভেন সিস্টার রাজ্য, শিলিগুড়ি করিডর, সীমান্তের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এ কথা বলা যায়৷ বিজেপি যদি তাদের জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে, তাহলে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে ২৫টি আসন জিততে পারে৷”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক জাদ মাহমুদ বলেন, পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুত্বের ধারণার অন্যতম উৎপত্তিস্থল৷ কিন্তু এখানকার মানুষ অতীতে কখনো বিজেপিকে সেভাবে সমর্থন জানায়নি৷ ফলে এটা বিজেপির কাছে আদর্শগত জয়৷
জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব
জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমশ দাপট বাড়ছে বিজেপির৷ কংগ্রেসের পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তি দুর্বল হচ্ছে৷ পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পাশাপাশি বিধানসভা ভোটে অসমে কংগ্রেস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে হেরেছে৷ বিজেপি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের এই অবস্থা কেন?
দেবাঞ্জন বলেন, ‘‘ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলির ভূমিকা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে৷ তারা কেন্দ্রে দোস্তি করেন, কিন্তু রাজ্যে রাজ্যে কুস্তি করতে দেখা যায়৷ রাহুল গান্ধী পশ্চিমবঙ্গে ভোট প্রচারে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আক্রমণ করেছেন, তাদের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ অথচ নির্বাচনের পরে আবার তিনি মমতার পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন৷”
জাদ মাহমুদ বলেন, ‘‘২০৪৭ সালের মধ্যে কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার যে স্বপ্ন বিজেপির রয়েছে, সেদিকে আর এক ধাপ তারা এগিয়ে গেল৷ উত্তর ও পশ্চিম ভারতে তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রয়েছে৷ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়মে, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় তাদের ক্ষমতা কমতে পারে৷ ফলে নতুন জায়গায় তাদের ক্ষমতা প্রসারিত করার ক্ষেত্রে বিজেপি সফল হয়েছে৷ এতে আগামী লোকসভা নির্বাচনে তাদের বেশি আসনে জয়ের সম্ভাবনা বাড়ল৷ বিজেপি যেভাবে ভারতকে নতুন রূপে দেখতে চায়, সেই লক্ষ্যে চলার পথে তাদের শক্তি বাড়ল৷”
তার বক্তব্য, ‘‘২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপি ধাক্কা খাওয়ার পরে যদি পশ্চিমবঙ্গে হারত, তাহলে সেটা বিরোধী জোটের কাছে ইতিবাচক হত৷ সামনেই উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন, তার আগে বঙ্গ বিজয়ের ফলে বিজেপির মনোবল বাড়ল৷ তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিন হেরেছেন, কিন্তু বিজেপি জেতেনি৷ এখানে বিজেপি জিতেছে যেখানে তারা কখনো ক্ষমতায় ছিল না৷”
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন৷ যদিও এর সঙ্গে একমত নন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত৷
তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘ভারত ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রী সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে বার্তা দিয়েছেন৷ এমনকি দলীয় স্তরে বিজেপি ও বিএনপি আলাপ-আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়েছে৷ সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার ফলে এই প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হবে বলে আমি মনে করি না৷ বরং কেন্দ্র ও রাজ্যে একই সরকার থাকার ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে৷”
ডিডাব্লিউডটকম
পায়েল সামন্ত ,ভারত 



















