ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়লেও আরব বিশ্বের শাসকদের অবস্থান আর সাধারণ মানুষের মনোভাবের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে। একদিকে উপসাগরীয় রাজতন্ত্র ও সামরিক শাসকরা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রচার চালাচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একটি অংশ ইরানকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ইরানবিরোধী প্রচার বাড়ানো হয়েছে। অনেক জায়গায় ইরানের প্রতি সহানুভূতি দেখানো ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হয়েছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলা বা তার প্রভাবের ভিডিও ধারণের অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। বাহরাইনে ইরানপন্থী অবস্থানের অভিযোগে কিছু মানুষের নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন এক প্রবণতা চোখে পড়ছে। ইরানের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে প্রশংসা করে তৈরি কিছু গান ও ভিডিও তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বদলে ইরানপন্থী লেবানিজ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ক্ষোভ
আরব সমাজে ইরানের প্রতি সহানুভূতির বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ফিলিস্তিন ইস্যু। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলার পর বহু আরব নাগরিকের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া খুব কম রাষ্ট্রের মধ্যে ইরান অন্যতম।
মিসরের কায়রোর এক তরুণ চিকিৎসক বলেন, সাধারণ মানুষ এখন এমন শক্তিকেই সমর্থন করছে যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তার মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান অনেক আরবের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় কিছু দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর অনেক সাধারণ মানুষ সেই অবস্থানকে ভালোভাবে নেয়নি। ফলে ইরানের প্রতি সহানুভূতি কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা ও শিয়া সংযোগ
ইরানের প্রতি সমর্থনের আরেকটি কারণ সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক। উপসাগরীয় অঞ্চলের বহু শিয়া মুসলিমের সঙ্গে ইরানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাহরাইনের শিয়াপ্রধান এলাকাগুলোতে ইরানের নেতাদের স্মরণে শোক মিছিলও দেখা গেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিপুলসংখ্যক ইরানি বসবাস করেন। দুবাইয়ে ইরানিদের স্কুল, ক্লাব ও ধর্মীয় কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মিসরের মতো সুন্নিপ্রধান দেশেও শিয়া ঐতিহ্য ও নবী পরিবারের প্রতি আবেগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি আরব বিশ্বের ভেতরে ধর্মীয় আবেগের এক নতুন রূপ তুলে ধরছে।
ইরানবিরোধী অবস্থানও প্রবল
তবে পুরো আরব বিশ্ব যে ইরানের পক্ষে, বিষয়টি এমন নয়। ইরানের সমর্থিত মিলিশিয়াদের কারণে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের বড় একটি অংশ এখনও তেহরানের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। অনেক সুন্নি গোষ্ঠী মনে করে, ইরানের প্রভাব বাড়লে তাদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিশেষ করে বাহরাইন ও উপসাগরীয় কিছু দেশে অনেকে আশঙ্কা করছেন, ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভেতর থেকে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। মিসরের কট্টরপন্থী সুন্নি গোষ্ঠীগুলোও শিয়াবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে।

অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও বদলাচ্ছে মানসিকতা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে জ্বালানির দাম বাড়ছে, কর্মসংস্থান কমছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করা বহু অভিবাসী নিজ দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও অনেক আরব নাগরিক এখন নিজেদের শাসকদের দুর্বল বলে মনে করছেন।
তাদের মতে, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও লড়াইয়ের মানসিকতা দেখাচ্ছে, যা আরব বিশ্বের অনেক নেতার মধ্যে দেখা যায় না। ফলে প্রকাশ্যে না হলেও নীরবে অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখন যে মতামত ফিসফিস করে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই হয়তো প্রকাশ্য রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















