রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর প্রয়োজন নতুন কিছু নয়। অর্থনীতি যখন চাপের মুখে পড়ে, কর আদায় কমে যায় এবং ব্যয় বাড়তে থাকে, তখন সরকার স্বাভাবিকভাবেই নতুন রাজস্বের পথ খোঁজে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই পথ যদি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তা কতটা কার্যকর নীতি হিসেবে টিকে থাকতে পারে?
ইন্দোনেশিয়ায় সম্প্রতি টোল রোডে ভ্যাট আরোপ এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির কর-সুবিধা কমিয়ে আনার যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটি শুধু করনীতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। সরকার একদিকে সবুজ জ্বালানি ও আধুনিক অবকাঠামোর কথা বলছে, অন্যদিকে সেই খাতগুলোকেই বাড়তি করের আওতায় আনছে। এই দ্বৈত অবস্থানই এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব বাড়ানোর যুক্তি অবশ্যই আছে। সরকার চায় করের আওতা বাড়াতে, কারণ রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে আছে। স্থানীয় প্রশাসনগুলোও বলছে, বৈদ্যুতিক গাড়িকে অতিরিক্ত ছাড় দিলে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কমে যায়। কাগজে-কলমে এই যুক্তিগুলো বাস্তবসম্মত মনে হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতি শুধু হিসাবের খাতা দিয়ে চলে না; মানুষের আচরণ, বাজারের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
টোল রোডে ১১ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবকে সরকার অতিরিক্ত রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখছে। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু টোল ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার চাপ শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দামেই এসে পড়বে। লজিস্টিক ব্যয় বাড়লে খাদ্য, ভোগ্যপণ্য এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যও বাড়ে। ফলে যেসব মানুষ হয়তো কখনো টোল রোড ব্যবহারই করেন না, তারাও পরোক্ষভাবে এই করের বোঝা বহন করবেন।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে—রাষ্ট্র কি এমন সময়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যখন মধ্যবিত্ত শ্রেণিই ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে নাজেহাল? করনীতি যদি মানুষের ভোগক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ধীর করে দিতে পারে।

একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রেও। গত কয়েক বছর ধরে ইন্দোনেশিয়া নিজেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন ও ব্যবহারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এবং মানুষকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসতে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন যদি সেই সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুরো বার্তাটাই বদলে যায়।
বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মধ্যবিত্ত ক্রেতা এবং রাইড-শেয়ারিং চালকেরা, যারা কম জ্বালানি খরচ ও দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ের কথা ভেবে এই প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছিলেন। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি এক ধরনের সতর্ক সংকেত। কারণ কোনো শিল্প খাত তখনই টেকসইভাবে গড়ে ওঠে, যখন নীতির ধারাবাহিকতা থাকে। আজ যে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, কাল যদি তা হঠাৎ তুলে নেওয়া হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
মূল সমস্যা শুধু কর বাড়ানো নয়; বরং সরকার যে লক্ষ্য সামনে রেখে এতদিন নীতি তৈরি করছিল, এখন সেই লক্ষ্য থেকেই যেন সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। টোল রোডকে বলা হয়েছিল দেশের উচ্চ পরিবহন ব্যয় কমানোর সমাধান। বৈদ্যুতিক গাড়িকে তুলে ধরা হয়েছিল জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর ভবিষ্যৎ কৌশল হিসেবে। কিন্তু এখন যদি এই দুই খাতকেই নতুন আর্থিক চাপে ফেলা হয়, তাহলে তা সরকারের নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সব ধরনের রাজস্ব সমান মূল্যবান নয়। এমন করনীতি, যা স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থ এনে দেয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, ভোক্তার আস্থা এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে দেয়, সেটি শেষ পর্যন্ত লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি ডেকে আনতে পারে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের আসল সাফল্য শুধু কত টাকা আদায় হলো, সেটি দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং দেখতে হয়—সেই রাজস্ব আদায়ের জন্য রাষ্ট্র কী হারাচ্ছে, আর ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির কোন সম্ভাবনাগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
তেঙ্গারা স্ট্র্যাটেজিকস 



















