ভারত আবারও সফলভাবে পরীক্ষা করেছে উন্নত অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র, যা একাধিক স্বাধীন লক্ষ্যবস্তুতে আলাদা আলাদাভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এমআইআরভি বা মাল্টিপল ইনডিপেনডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল প্রযুক্তিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উড্ডয়ন পরীক্ষা ভারতের কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ওড়িশার ড. এপিজে আবদুল কালাম দ্বীপ থেকে শুক্রবার এই পরীক্ষা চালানো হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি একাধিক পে-লোড বহন করে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। পরীক্ষার সব লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
এক ক্ষেপণাস্ত্রে একাধিক আঘাতের সক্ষমতা
এই এমআইআরভি প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকেই একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো সম্ভব। এর ফলে একটি মাত্র অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমেই শত শত কিলোমিটার দূরের একাধিক স্থানে হামলা চালানো যায়।
ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথ ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে ভূমিভিত্তিক এবং জাহাজভিত্তিক একাধিক ট্র্যাকিং স্টেশন ব্যবহার করা হয়। উৎক্ষেপণের পর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা পর্যন্ত পুরো ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
যদিও সরকারিভাবে জানানো হয়নি অগ্নি-৫-এর এমআইআরভি সংস্করণে ঠিক কতটি ওয়ারহেড বহন করা যায়, তবে সামরিক বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এটি চার থেকে পাঁচটি পর্যন্ত ওয়ারহেড বহনে সক্ষম হতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, এই সফল পরীক্ষা দেশের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং উদীয়মান নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে ভারতের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
‘মিশন দিব্যাস্ত্র’ থেকে নতুন অগ্রগতি
ভারত প্রথমবার অগ্নি-৫ এমআইআরভি প্রযুক্তির পরীক্ষা চালায় ২০২৪ সালের মার্চে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই পরীক্ষার নাম দিয়েছিলেন ‘মিশন দিব্যাস্ত্র’। ওই পরীক্ষার মাধ্যমে ভারত এমন একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অংশ হয়ে ওঠে, যাদের কাছে এমআইআরভি প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন।
তিন ধাপের কঠিন জ্বালানিচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করা অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা পাঁচ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও অগ্নি সিরিজের আরও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর মধ্যে অগ্নি-১-এর পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার, অগ্নি-২ দুই হাজার কিলোমিটার, অগ্নি-৩ তিন হাজার কিলোমিটার এবং অগ্নি-৪ চার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে।

পারমাণবিক নীতিতে ভারতের অবস্থান
ভারতের ২০০৩ সালের পারমাণবিক নীতিতে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার অঙ্গীকার রয়েছে। অর্থাৎ, ভারত কেবল পারমাণবিক হামলার জবাব হিসেবেই এই অস্ত্র ব্যবহার করবে।
তবে একই সঙ্গে নীতিতে বলা হয়েছে, ভারতের ওপর যদি পারমাণবিক হামলা হয়, তাহলে তার পাল্টা জবাব হবে ব্যাপক এবং ভয়াবহ ক্ষতির উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
ভারতের পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে। নিউক্লিয়ার কমান্ড অথরিটির রাজনৈতিক কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাহী কাউন্সিলের নেতৃত্বে থাকেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—এই তিন দিক থেকেই পারমাণবিক হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে ভারতের। সম্প্রতি দেশটি নিজেদের তৃতীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন আইএনএস অরিদামান নৌবাহিনীতে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে ভারতের পারমাণবিক ত্রয়ী সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপট
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপরির গত বছরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের কাছে আনুমানিক ১৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের কাছে ছিল প্রায় ১৭০টি এবং চীনের কাছে প্রায় ৬০০টি।
ভারতের সাম্প্রতিক এই অগ্নি-৫ পরীক্ষা দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য এবং প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ভারতের অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল এমআইআরভি পরীক্ষা কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















