বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন শুধু উৎপাদন করলেই চলবে না, সেই উৎপাদন কতটা “সবুজ” সেটিও প্রমাণ করতে হবে। আগামী দশকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে শুধু কারখানা, বিদ্যুৎ বা কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ করবে না; নিয়ন্ত্রণ করবে কার্বন মানদণ্ড, পরিবেশগত সনদ এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতির নতুন কাঠামো। এই বাস্তবতায় ইন্দোনেশিয়ার সামনে এক বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে—শুধু আঞ্চলিক উৎপাদনশক্তি হওয়া নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবুজ অর্থনীতির নিয়ম নির্ধারণকারী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া।
গত কয়েক বছরে জাকার্তা ধীরে ধীরে এমন এক অর্থনৈতিক কৌশল গড়ে তুলেছে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকে স্থানীয় শিল্পনীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা নিকেল প্রক্রিয়াকরণ—সব ক্ষেত্রেই সরকার এমন নীতি গ্রহণ করেছে, যা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশীয় উৎপাদন অবকাঠামো গড়তে উৎসাহিত করেছে। স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, বিশেষ করে টিকেডিএন নীতি, শুরুতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেও এখন সেটিই শিল্প সম্প্রসারণের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের তাৎপর্য শুধু শিল্পায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইন্দোনেশিয়া বুঝতে শুরু করেছে যে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে কাঁচামাল রপ্তানিকারক হিসেবে নয়, বরং শর্ত নির্ধারণকারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ২০২০ সালে কাঁচা নিকেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত সেই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। ফলাফলও দৃশ্যমান। বিদেশি কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়েছে দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ করতে, আর সেই প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনকেন্দ্রিক নতুন শিল্পভিত্তি।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। ইন্দোনেশিয়া কি শুধু নিজের অভ্যন্তরীণ বাজারে নিয়ম তৈরি করেই সন্তুষ্ট থাকবে, নাকি সেই নিয়মকে আঞ্চলিক মানদণ্ডে রূপান্তর করবে?
কারণ বাস্তবতা হলো, এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে “সবুজ সনদ”। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম বা সিবিএএম কার্যত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আমদানিকৃত পণ্যের উৎপাদনে কত কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, তার ভিত্তিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। একই সময়ে জাপান এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি গড়ছে, আর চীন নিজস্ব সবুজ আর্থিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করছে। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে একাধিক “সবুজ পাসপোর্ট” তৈরি হচ্ছে, যার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কোন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্য হবে।
এই পরিস্থিতিতে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান এখনও মূলত নিয়ম মান্যকারীর। অন্যরা মানদণ্ড তৈরি করছে, আর ইন্দোনেশিয়াকে সেই মানদণ্ডের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। সমস্যাটি কেবল সার্বভৌমত্বের নয়; এটি অর্থনৈতিক ব্যয়ের প্রশ্নও। বিদেশি বাজারে প্রবেশের জন্য দেশীয় রপ্তানিকারকদের একাধিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে, যার প্রতিটি তৈরি হয়েছে ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় বহন করবে স্থানীয় শিল্প ও ভোক্তারা।

এই কারণেই বর্তমান সময়টিকে জাকার্তার জন্য একটি কৌশলগত মোড় বলা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এখনো পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সবুজ কাঠামো তৈরি হয়নি। আসিয়ান ধীরগতিতে এগোচ্ছে, আর সেই শূন্যতার মধ্যেই নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া যদি এখন নিজস্ব সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির নিবন্ধন কাঠামো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে, তবে ভবিষ্যতের বাণিজ্য কাঠামোয় তার প্রভাব অনেক গভীর হবে।
বিশেষ করে সিঙ্গাপুরে বিদ্যুৎ রপ্তানির পরিকল্পনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। আগামী দশকে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ আমদানি করতে চায় সিঙ্গাপুর, যেখানে ইন্দোনেশিয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সেই বিদ্যুৎ “পরিচ্ছন্ন” হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ প্রয়োজন। বর্তমানে যে ব্যবস্থা চালু আছে, তা ইউরোপভিত্তিক। অর্থাৎ, ইন্দোনেশিয়ার উৎপাদিত বিদ্যুৎও বিদেশি নিয়মের অধীনেই স্বীকৃতি পাবে।
এখানেই কৌশলগত দূরদৃষ্টির প্রয়োজন। জাকার্তা যদি স্থানীয় শিল্পনীতিকে কম-কার্বন সনদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একটি সৌর প্যানেল যদি একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, ইউরোপ ও জাপানের মানদণ্ড পূরণ করতে পারে, তাহলে সেটি কেবল রপ্তানি সুবিধাই দেবে না; বরং ইন্দোনেশিয়াকে মান নির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে আসবে।
তবে এই প্রতিযোগিতা একমুখী নয়। ভিয়েতনাম ইতোমধ্যেই জাতীয় নির্গমন বাণিজ্য ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফলে ইন্দোনেশিয়ার সামনে সময় খুব বেশি নেই। যদি অন্য কোনো দেশ আঞ্চলিক মানদণ্ডের মূল রেফারেন্সে পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের নিয়মও তাদের শিল্প বাস্তবতা অনুযায়ী গড়ে উঠবে। তখন জাকার্তাকে অন্যের লেখা কাঠামোর মধ্যেই চলতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ইন্দোনেশিয়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি সতর্ক ও প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান বজায় রেখেছে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। দেশটির বাজার বড় হয়েছে, শিল্পভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। এখন প্রশ্ন কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতার নয়; প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবুজ অর্থনীতির নিয়ম আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই নির্ধারিত হবে। ইন্দোনেশিয়ার হাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ইতোমধ্যেই আছে। এখন দেখা বাকি, দেশটি সেই উপকরণ দিয়ে শুধু শিল্প গড়বে, নাকি পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ভাষাও লিখবে।
আলথফ এন্দাওয়ানসা 


















