যুদ্ধের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে আমরা সাধারণত মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপ, ক্ষুধা কিংবা বাস্তুচ্যুতির কথা বলি। কিন্তু এমন একটি সহিংসতা আছে যা প্রায়শই পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে যায়—যৌন নির্যাতন। কারণ এটি শুধু শরীরকে আঘাত করে না; এটি মানুষের মর্যাদা, পরিচয় এবং সামাজিক অস্তিত্বকে ধ্বংস করার অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে এই বাস্তবতা নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনি বন্দি ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা আন্তর্জাতিক বিবেকের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলি নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয়েছিল। পশ্চিমা নেতা থেকে শুরু করে মানবাধিকার সংগঠন—অনেকে সেসময় বলেছিলেন, রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত। কিন্তু একই নৈতিক মানদণ্ড কি ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে? এখানেই তৈরি হয়েছে গভীর এক নীরবতা।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও সাবেক বন্দিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে যে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতন বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি অপমান, দমন এবং মানসিক ভাঙন তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভিযোগগুলো শুধু নারী নয়, পুরুষ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এসেছে। কেউ বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় নগ্ন করে নির্যাতন করা হয়েছে; কেউ বলেছেন, যৌনাঙ্গে আঘাত, ধর্ষণের হুমকি কিংবা বস্তু ব্যবহার করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেকেই আবার পরিবার ও সমাজের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি।

এই নীরবতার পেছনে শুধু ভয় নয়, সামাজিক কাঠামোরও বড় ভূমিকা আছে। আরব সমাজের রক্ষণশীল বাস্তবতায় যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেকের কাছে ব্যক্তিগত লজ্জা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ভুক্তভোগীরা প্রায়ই নিজেদের অভিজ্ঞতা গোপন রাখেন। এতে অপরাধীরা আরও বেশি দায়মুক্তি পায়। যখন একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোতে জবাবদিহির অভাব তৈরি হয়, তখন নির্যাতন ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ আচরণে পরিণত হতে পারে।
ইতিহাস বলে, যুদ্ধক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা কখনোই কেবল আকস্মিক বর্বরতা নয়। বসনিয়া, রুয়ান্ডা, সুদান কিংবা ইরাক—প্রতিটি সংঘাতে দেখা গেছে, মানুষকে মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘শত্রু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে নির্যাতনের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। যখন রাজনৈতিক ভাষণে কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘পশু’, ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘অমানুষ’ হিসেবে দেখানো হয়, তখন নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশ সেই ভাষাকেই অনুমোদন হিসেবে ধরে নিতে পারে। এই মনস্তত্ত্বই যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্রে রূপ দেয়।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো দায়মুক্তি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দাবি, বহু অভিযোগ দায়ের হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর তদন্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও অভিযোগ উঠেছে যে নির্যাতনের ভিডিও বা সাক্ষ্য সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলে নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—এই ধরনের অপরাধের পরিণতি নেই।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অনেক দেশ ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে থাকে। ফলে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, যখন মিত্র রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসে, তখন কি একই কঠোরতা দেখানো হয়? নাকি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়? যুদ্ধের সময় মানবাধিকারের প্রশ্ন যদি বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক ভিত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অবশ্যই হামাসের সহিংসতা বা বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো পক্ষের অপরাধ অন্য পক্ষের অপরাধকে বৈধতা দেয় না। বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল শক্তিই হলো—এটি শত্রু ও মিত্র, উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যৌন নির্যাতনকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বিচার করা শুরু হলে, শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের ধারণাটাই ভেঙে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি স্থায়ী রূপ নিতে পারে। বন্দিশিবির, চেকপয়েন্ট কিংবা দখলকৃত অঞ্চলে যদি নিয়মিত অপমান ও নির্যাতন ঘটে, তাহলে তা শুধু ভুক্তভোগীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে আরও গভীর ক্ষোভ ও প্রতিশোধের বীজ বপন করে। এই বাস্তবতা শান্তির সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে দেয়।
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক অবস্থান নয়, নৈতিক সামঞ্জস্য। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন যদি সত্যিই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয়, তাহলে তা যে-ই করুক না কেন, একই স্পষ্ট ভাষায় তার নিন্দা হওয়া দরকার। আন্তর্জাতিক তদন্ত, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং বন্দিদের জন্য মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে এই অভিযোগগুলো আরও বাড়বে, আর নীরবতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলবে।
যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো আসে তখনই, যখন মানুষ অন্য মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট সেই সীমারেখার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
নিকোলাস ক্রিস্টফ 



















