“আমি যখন এখানে আসি, তখন এই ফ্যাকাল্টির ডিন ছিল একজন নার্স। বাংলাদেশে আপনি মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিগুলোর নার্সিং ফ্যাকাল্টিতে কোনো ডিন কিন্তু আপনি নার্স পাবেন না”, বলছিলেন জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টোরাল ফেলোশিপে থাকা বাংলাদেশের সিনিয়র স্টাফ নার্স ড. মো. নাহিদ উজ জামান।
সম্মান কিংবা আয়-ব্যয়ের মতো দিক থেকে বিদেশের সাথে বাংলাদেশের নার্সিং পেশার তুলনা করলে “আকাশ-পাতাল তফাৎ”-এর কথা বলছিলেন কানাডার রেজিস্টার্ড নার্স মোনসেফা আক্তারও।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি ৯০ লাখ নার্স রয়েছে। তারপরও ২০৩০ সাল নাগাদ নার্সের ঘাটতি গড়াতে পারে ৪৫ লাখে।
ফিলিপিন্স, ভারত আর পোল্যান্ড থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নার্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যায় নার্সের চাহিদার যোগানদাতা হবার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশেরও।
কিন্তু ভাষা থেকে শুরু করে কাঠামোগত জটিলতার মতো নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা কঠিন হয়ে উঠছে বলে জানাচ্ছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
পরিসংখ্যান বলছে, আগের তুলনায় বাংলাদেশে এখন অনেক বেশি মানুষ নার্সিং পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠছে।
ফলে এই জনবলকে বিশ্ববাজারের জন্য দক্ষভাবে গড়তে পারলে একদিকে তা যেমন মানবসম্পদ হয়ে উঠবে, তেমনি দেশের উন্নতিতেও ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন তারা।

চিকিৎসক বনাম নার্সের অনুপাত যেখানে থাকার কথা ১:৩, সেখানে বাংলাদেশে আছে ১.১:১
সামনে আসছে দক্ষ জনবল, প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতার কথা
মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াতেও নার্সদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ জনবল গড়ার বিষয়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ড. মো. শরিফুল ইসলাম।
“আমাদের যে সেকেলে ব্রিটেশ আমলের নার্সিং এডুকেশন সিস্টেম এ দিয়ে তো হবে না। আমাদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড চিন্তা করতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কারিকুলামটা ইন্ট্রডিউস করাতে হবে”, বলেন তিনি।
মি. ইসলামের মতে, বর্তমান পাঠ্যসূচির ৭০ শতাংশ তত্ত্বভিত্তিক, কিন্তু হওয়া উচিত ছিল ৭০ শতাংশ হাতে কলমে শেখা। “সে জায়গাটায় উল্টো চিত্র”।
এছাড়া ভাষাগত দক্ষতার অভাব, এসব দেশে নার্সিং পেশায় রেজিস্ট্রেশনের জন্যে দেয়া এনক্লেস পরীক্ষার সেন্টার দেশে না থাকা এবং দেশীয় পরীক্ষার মানসহ নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে আগ্রহীদের।
২০২৩ সালে কানাডায় যান মোনসেফা আক্তার। বর্তমানে দেশটিতে নিবন্ধিত নার্স হিসেবে কাজ করছেন তিনি। এর আগে সাত বছর বাংলাদেশেও যুক্ত ছিলেন একই পেশায়।
“বাংলাদেশের পড়াশোনার যদি তুলনা করি, আমার কাছে মনে হয়েছে আমি নার্সিংয়ের আসলে কিছুই জানি না। এখানে আসার পর আবার নতুন করে আমাকে নার্সিং পড়তে হয়েছে, জানতে হয়েছে”, বলেন তিনি।
এমনকি দেশের বাইরে যাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা না পাওয়ার কথাও বলছেন মিজ আক্তার। যেমন, বিদেশে গিয়ে নার্সিং করতে হলে সেখান থেকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য শিক্ষা এবং রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানে দুইটি ফর্ম পাঠানো হয়।

“বাংলাদেশে নার্স হিসেবে সেই সম্মানটা ছিল না”, বলেন কানাডায় নিবন্ধিত বাংলাদেশি নার্স মোনসেফা আক্তার।
কিন্তু সেগুলো পাওয়ার জন্যেও তাকে “ব্যক্তিগতভাবে যথেষ্ট হ্যাসেল (ঝামেলা) নিতে হয়েছে” বলে জানান মোনসেফা আক্তার।
আবার বাইরের দেশে যেমন বিশেষায়িত নার্সের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশে সেই দিকটিতেও যথেষ্ট নজর দেয়া হচ্ছে না।
“বাংলাদেশে সবাই আমরা জেনারেল নার্স। কিন্তু সারাবিশ্বে কিন্তু স্পেশালাইজড নার্স খোঁজে। অর্থাৎ তাদের চাহিদা অনুযায়ী আইসিইউ নার্স, ওটি নার্স, এই জায়গাগুলোতে আমরা যদি ফোকাস করতে পারি বা আমরা যদি ক্লিনিক্যাল সাইডে স্পেশালাইজড নার্স তৈরি করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সারাবিশ্বে বড় একটা মুক্ত বাজার তৈরি হবে”, বলেন ড. মো: নাহিদ উজ জামান।
বাড়ছে প্রতিষ্ঠান, কিন্তু দেশেই থাকছে ঘাটতি
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এবছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে এই অনুপাত একেবারেই উল্টো।
দেশটিতে বর্তমানে চিকিৎসক সংখ্যা এক লাখ ২৩ হাজার ৮৫৩ জন, দন্তচিকিৎসক ১২ হাজার ৯৪০ জন আর মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ৩০ হাজার ৭৯৫ জন। অন্যদিকে ধাত্রীসহ নিবন্ধিত নার্সের সংখ্যা এক লাখ ৫৩ হাজার ৬১৩ জন।
ফলে চিকিৎসক বনাম নার্সের অনুপাত যেখানে থাকার কথা ১:৩, সেখানে বাংলাদেশে আছে ১.১:১।
এছাড়া প্রতি ১০ হাজার রোগীর জন্য বাংলাদেশে নার্স আছেন ছয় দশমিক ছয় শতাংশ, যেখানে একই জনসংখ্যার জন্য নেপালে আছেন ৪০ দশমিক ৯ জন আর মালদ্বীপে ৫০ দশমিক দুই শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার হিসেবে পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের পরই সবচেয়ে কম সংখ্যক নার্স আছে বাংলাদেশে।
এদিকে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৬৪টি নার্সিং ইন্সটিটিউট ও কলেজ আছে। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৭টি।
তারপরও বাংলাদেশে প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় নার্সের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল।

গত ১৬ বছরে নার্সিং কলেজ ও ইন্সটিটিউটের সংখ্যা বাড়লেও চাহিদার তুলনায় নার্সের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল
আর এর কারণ হিসেবে সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদার পাশাপাশি কর্মজীবনের উন্নতির সুযোগ স্বল্পতার মতো দিকগুলোও সামনে আসছে।
“ক্যারিয়ার ল্যাডার স্মুথলি এগোনো প্রয়োজন। আমরা এখন বোটল নেক অবস্থায় আছি। মানে বোতলের পেটের মধ্যে সব সিনিয়র স্টাফ নার্স আর কিছু কিছু চেয়ারে যারা অবস্থান করছি। আমার মনে হয় বিন্যাসটা যদি সুন্দর হয়, তাহলে নিচের জায়গাটা খালি হবে। তখন মানুষের মধ্যে আগ্রহটা সৃষ্টি হবে”, বলছিলেন আয়াত কলেজ অব নার্সিং এন্ড হেলথ সায়েন্সেস-এর অধ্যক্ষ তাছলিমা বেগম।
আবার উন্নত বিশ্বে যেখানে নার্সিং প্রথম শ্রেণির চাকরি, সেখানে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে নার্সদের প্রাথমিক বেতন শুরু হয় ১০ম গ্রেড থেকে—যা সাধারণভাবে বিবেচিত হয় ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’ হিসেবে।
বাংলাদেশের সাথে কানাডার আয় অনুযায়ী ব্যয়ের তুলনা করলে অনেক পার্থক্য রয়েছে বলে জানান মিজ মোনসেফা আক্তার।
যেখানে দেশে আয়ের পুরোটাও জীবনযাপনের জন্য কখনও কখনও যথেষ্ট ছিল না, সেখানে বিদেশে আয়ের অর্ধেক দিয়েই ‘কম্ফোর্টেবল’ থাকা যায় বলে জানান তিনি।
এছাড়া কানাডায় নার্সিং করার সময় যে সম্মান পেয়েছে নিজের দেশে তা পাননি বলে মন্তব্য করেন মোনসেফা আক্তার।
“একটা ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রিতে যে পরিমাণ রেসপেক্ট বাংলাদেশি নার্স হিসেবে পেয়েছি, আমি আমার নিজের কান্ট্রিতেও হয়তো আমি যখন কাজ করেছি সেই রেস্পেক্টটা আমার ছিল না,” তিনি বলছিলেন।
মিজ আক্তার বলেন, “আমাদের ডাক্তারদের সাথে যে সম্পর্ক সেটা খুবই অন্যরকম। বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলে ডাক্তারদের যেরকম আমাদের বস ভাবা হয়, কিন্তু এখানে আমরা সবাই কলিগ। এখানে সবাই সবাইকে সম্মান করতে হয়”।

বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ড. মো. শরিফুল ইসলাম
প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ আর পরিকল্পনা
পেশায় প্রবেশের আগেই দেশের বাইরে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন নার্সিংয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের অনেকে।
আয়াত কলেজ অব নার্সিং এন্ড হেলথ সায়েন্সেস-এর চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সূচনা তেরেজা গোস্তা। পড়াশোনা শেষ করে পাড়ি জমাতে চান যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি বলেন, “ওখানে জব সিকিউরিটি অনেক ভালো প্লাস ওখানকার মানুষজন রুলস-রেগুলেশন্স অনেক বেশি মেনে চলে”।
একই কলেজে পড়ছেন সুরাইয়া জাহানও। তিনি জানান, উচ্চতর শিক্ষার জন্য তার দেশের বাইরে যাওয়ার আগ্রহ আছে।
বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশের নিবন্ধনকৃত দেড় লাখের কিছু বেশি নার্সদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৫৮ জন সরকারি চাকরি করেন। আর বাকিদের একটি অংশ যুক্ত আছে বেসরকারি খাতে, আরেকটি অংশ বেকার।
অথচ দক্ষভাবে গড়ে তুলতে পারলে একদিকে তারা যেমন দেশের চাহিদা পূরণ করতে পারবে, অন্যদিকে বিদেশেও তৈরি হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ আর পরিকল্পনার দিকটিতেই জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
“যেহেতু স্বাস্থ্য খাতে নার্সিং অনেক বড় ওয়ার্কফোর্স, এদের কন্ট্রিবিউশন অনেক। এদের যদি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে আমার মনে হয় দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করেও আমরা বিদেশে নার্স পাঠাতে পারবো”, বলেন ড. মো. শরিফুল ইসলাম।
বিবিসি নিউজ বাংলা
তানহা তাসনিম 



















