ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে পেট্রোলের দাম দ্রুত বাড়ায় এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অর্থনীতিতে। এতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। মার্চে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ টানা দুই মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
জ্বালানির দামই মূল চালিকাশক্তি
এপ্রিল মাসে মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ। এর বড় অংশ এসেছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে। এক মাসে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গত এক বছরে এই বৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফলে শুধু পরিবহন নয়, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরেও খরচ বাড়ছে। আবাসন ব্যয়ও এপ্রিল মাসে ০ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ চাপ
বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার মে ২০২৩ সালের পর সবচেয়ে বেশি। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও এপ্রিলের মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ায় বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কারণ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তুলতে চেয়েছিল হোয়াইট হাউস।

ফেডের জন্যও নতুন পরীক্ষা
এই পরিস্থিতিকে ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্প মনোনীত কেভিন ওয়ার্শের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি জেরোম পাওয়েলের স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির বর্তমান ধারা ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে সময় ইরানি বিপ্লবের পর তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় দফার বড় মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল।
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের অর্থনীতিবিদ অলিভিয়ের কোইবিওন এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের ইউরি গোরোদনিচেঙ্কো সতর্ক করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিও নতুন এক ‘দ্বিতীয় ঢেউ’-এর সূচনা হতে পারে।
প্রত্যাশিত মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোলের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের মূল্যস্ফীতি নিয়ে প্রত্যাশাও দ্রুত বেড়ে যায়। মানুষ যদি ধরে নেয় সামনে আরও দাম বাড়বে, তাহলে মজুরি দাবি ও পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে পুরো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইউরি গোরোদনিচেঙ্কো বলেন, অনেক পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন সুদের হারের চেয়েও দ্রুত মূল্যস্ফীতি বাড়বে বলে মনে করছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ফেডকে আরও কঠোর সুদনীতি নিতে হতে পারে।
অনলাইন মূল্যসূচকেও ঊর্ধ্বগতি
স্টেট স্ট্রিটের প্রাইসস্ট্যাটস সূচক, যা অনলাইন খুচরা বাজারের লাখো পণ্যের দৈনিক মূল্য পর্যবেক্ষণ করে, এপ্রিল মাসে ০ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০০৮ সালের পর এটি সূচকটির তৃতীয় সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি।
এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সূচকে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর বেশিরভাগ চাপ এসেছে যানবাহনের জ্বালানি খাত থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও গৃহস্থালি পণ্যের দাম তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত থাকলেও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















