ভারত মহাসাগরের কৌশলগত অঞ্চল চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভারত, মরিশাস ও মালদ্বীপকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই জটিল পরিস্থিতিতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে উঠে এসেছে চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন। বিশেষ করে দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটিকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দিয়েগো গার্সিয়ার গুরুত্ব কেন এত বেশি
দিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। বহু বছর ধরে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এই ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। সেখানে মার্কিন বোমারু বিমান, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও নজরদারি অবকাঠামো রয়েছে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে রাজার ভাষণে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ না হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, বহুদিনের আলোচিত এই পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মালদ্বীপের অবস্থান ঘিরে নতুন প্রশ্ন
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন মালদ্বীপ নতুন করে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের মালিকানার দাবি তোলে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীনঘেঁষা অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছেন। তার সরকার পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে এসে ঐতিহাসিক অধিকারের দাবি সামনে আনে।
এরপর মরিশাস মালদ্বীপের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, মালদ্বীপ কি একাই এই অবস্থান নিয়েছে, নাকি এর পেছনে চীনের কৌশলগত সমর্থন রয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব দ্রুত বেড়েছে এবং দেশটি শক্তিশালী নৌ সক্ষমতাও গড়ে তুলেছে।
চীনকে ঘিরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব
চাগোস ইস্যুতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানেও রয়েছে বড় কৌশলগত হিসাব। মরিশাসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর প্রভাব এবং ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের কারণে নয়াদিল্লি শুরু থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, মরিশাসের কাছে সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দিলে চীনের সমুদ্রভিত্তিক দাবির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
এই কারণেই ২০২২ সালে ব্রিটেন ও মরিশাসের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। শর্ত ছিল, দিয়েগো গার্সিয়ার সামরিক ঘাঁটি অন্তত আগামী ৯৯ বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
)
ভারত মহাসাগরে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
ভারত মহাসাগর এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। মরিশাসের আগালেগা দ্বীপে ভারত ও মরিশাস যৌথভাবে নতুন বিমানঘাঁটি ও জেটি নির্মাণ করেছে। সেখানে ভারতের সামুদ্রিক নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে চীনের প্রভাব মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও তাদের মিত্ররা ভারত মহাসাগরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। অন্যদিকে চীনও এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় রয়েছে। ফলে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ এখন শুধু একটি দ্বীপাঞ্চল নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
চাগোসবাসীর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভূমিতে ফেরার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একইভাবে মরিশাসকেও সার্বভৌমত্ব ফিরে পেতে আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আপাতত অপরিবর্তিত থাকছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ভারত মহাসাগরের এই উত্তেজনা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন এই অঞ্চলের রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















