মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সাময়িকভাবে থেমে গেলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে গভীর সংকটের ছায়া নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে আছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেল, গ্যাস, পর্যটন ও বাণিজ্যে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলো শুরুতে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে অর্থনীতিকে সচল রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সময় যত বাড়ছে, ততই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে এখনো বড় মতবিরোধ রয়ে গেছে। এই অচলাবস্থা দ্রুত কাটার সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে।
উপসাগরের প্রাণশক্তি তেল-গ্যাস খাত
এই সংকটে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তেল ও গ্যাস খাতে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে, আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি কমেছে প্রায় অর্ধেকে। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন থেকে রপ্তানিও প্রায় থমকে গেছে। এই খাতই উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট অর্থনীতির বড় অংশ এবং সরকারি আয়ের প্রধান উৎস।
কিছুদিন আগে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হলেও সেটি ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। ভবিষ্যতে এমন যাতায়াত অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পর্যটন খাতে ভয়াবহ ধস
উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেক বড় খাত পর্যটনও এখন মারাত্মক সংকটে। যুদ্ধের আগে এই খাত অঞ্চলটির অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ছিল। বর্তমানে বিমান চলাচল সীমিতভাবে চালু থাকলেও পর্যটক প্রায় নেই বললেই চলে। দুবাই, দোহা ও রিয়াদের বিমানবন্দরে কিছু যাত্রী দেখা গেলেও হোটেলগুলো প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।

দুবাইয়ের হোটেলগুলোর দখল হার নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। বাহরাইনে হোটেল খাতে ব্যয়ের পরিমাণও তীব্রভাবে নেমে এসেছে। হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন অথবা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষ এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
দৈনন্দিন জীবনেও চাপ
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে গেছে। সৌদি আরবের লোহিত সাগর বন্দর ব্যবহার করে স্থলপথে পণ্য পাঠানো হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। বাজারে পণ্যের বড় সংকট না থাকলেও খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অনেক রেস্তোরাঁ জনপ্রিয় বিদেশি খাবার সরবরাহ করতে পারছে না। বিলাসপণ্যের ঘাটতিও চোখে পড়ছে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতায় পার্থক্য
উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও এক নয়। কাতার বলছে, তারা আরও কয়েক মাস পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যাংকগুলোও এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বাহরাইনের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো ইতোমধ্যেই আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি গ্রীষ্ম শেষ হওয়ার আগেই যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা না হয় এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেওয়া হয়, তাহলে সাময়িক সংকট স্থায়ী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
Sarakhon Report 



















