থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে ভারতের দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ মাঝআকাশে হঠাৎ প্রবল টার্বুলেন্সের মুখে পড়ে প্রায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজটি নিরাপদেই দিল্লিতে অবতরণ করে। ঘটনায় ১০ জন যাত্রী ও চারজন কেবিন ক্রুকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হলেও কারও গুরুতর আঘাতের খবর পাওয়া যায়নি।
এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে পরিচালিত এআই২৩৭৯ ফ্লাইটটি যাত্রাপথে স্বল্প সময়ের জন্য টার্বুলেন্সে পড়ে উচ্চতা হারায়। উড়োজাহাজটি সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে নিরাপদে দিল্লিতে পৌঁছায়।
বর্ষাকালে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশপথে কেন এমন ঘটনা ঘটতে পারে এবং টার্বুলেন্সের প্রকৃতি কী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে হিন্দুস্তান টাইমস।
বর্ষার আকাশে কেন ঝুঁকি বাড়ে
ফ্লাইট এআই২৩৭৯ ফুকেট থেকে আন্দামান সাগর, বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে ভারতের ওডিশা উপকূল দিয়ে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করে দিল্লির দিকে এগোচ্ছিল। আগস্ট মাসে এই পুরো করিডর বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ ও বজ্রঝড়প্রবণ অঞ্চলের অন্যতম।
এই সময় মৌসুমি নিম্নচাপ অক্ষরেখা গাঙ্গেয় সমভূমির ওপর অবস্থান করে। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে এর মিলনে বিশাল আকারের কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়, যেগুলোর উচ্চতা প্রায় ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এসব মেঘের ভেতরে ও আশপাশে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ তৈরি হয়, যা উড়োজাহাজের জন্য টার্বুলেন্সের বড় কারণ।
তবে ঠিক কোন স্থানে উড়োজাহাজটি টার্বুলেন্সে পড়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
টার্বুলেন্স কীভাবে যাত্রীদের প্রভাবিত করে
বিমান চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ ফুট উচ্চতা কমে যাওয়া প্রযুক্তিগতভাবে খুব বড় বিচ্যুতি নয়। কিন্তু উড়োজাহাজ যখন ক্রুজিং উচ্চতায় থাকে, তখন এমন আকস্মিক পরিবর্তন কেবিনের ভেতরে তীব্র ধাক্কার অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে যেসব যাত্রীর সিটবেল্ট বাঁধা থাকে না, তারা জড়তার কারণে আসন থেকে ছিটকে যেতে পারেন অথবা কেবিনের ভেতরের অংশে আঘাত পেতে পারেন। তাই সিটবেল্ট নির্দেশনা মেনে চলা এমন পরিস্থিতিতে আঘাতের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।

টার্বুলেন্সের ধরন
বিমান চলাচলে সাধারণত তিন ধরনের টার্বুলেন্স দেখা যায়।
প্রথমটি কনভেকটিভ টার্বুলেন্স, যা বজ্রঝড় ও কিউমুলোনিম্বাস মেঘের ভেতরে বা আশপাশে সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়টি ক্লিয়ার-এয়ার টার্বুলেন্স (সিএটি), যা মেঘহীন আকাশে উচ্চতায় বায়ুর গতির পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয়।
তৃতীয়টি মাউন্টেন-ওয়েভ টার্বুলেন্স, যা পাহাড়ি অঞ্চলের ওপর দিয়ে বায়ুপ্রবাহের সময় সৃষ্টি হয়।
বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরের আকাশে মূলত কনভেকটিভ টার্বুলেন্সই বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ বজ্রগর্ভ মেঘের ভেতরের বায়ুপ্রবাহ এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে উড়োজাহাজকে সেই অঞ্চল এড়িয়ে চলতে হয়।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কীভাবে হয়
বিমান পরিচালনায় টার্বুলেন্সের ঝুঁকি কমাতে একাধিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। উড়োজাহাজের সামনের আবহাওয়া রাডার বৃষ্টিপাত ও বজ্রঝড় শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি আগে ওই পথে উড়ে যাওয়া পাইলটদের প্রতিবেদন এবং স্বয়ংক্রিয় তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন আঞ্চলিক এভিয়েশন আবহাওয়া কেন্দ্র সম্ভাব্য বজ্রঝড়, টার্বুলেন্স, বরফ জমার ঝুঁকি বা ঘূর্ণিঝড়সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করে, যা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছে যায়।
তবে এসব ব্যবস্থা অধিকাংশ ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারলেও প্রতিটি টার্বুলেন্স আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
উষ্ণায়নের প্রভাব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়ছে, যা আরও শক্তিশালী বজ্রঝড় তৈরিতে সহায়তা করছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের কিছু অঞ্চলে ক্লিয়ার-এয়ার টার্বুলেন্সের মাত্রাও গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যদিও ভারতীয় আকাশসীমা নিয়ে একই ধরনের বিস্তৃত গবেষণা এখনো হয়নি, তবুও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, উষ্ণায়নের কারণে উচ্চ বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন ভবিষ্যতে টার্বুলেন্সের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, যথাযথ পরিকল্পনা, আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় বর্ষাকালে বিমান ভ্রমণকে অনিরাপদ বলা যায় না। যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা হলো পুরো যাত্রায় সিটবেল্ট বেঁধে রাখা।
বর্ষার টার্বুলেন্সে এয়ার ইন্ডিয়ার ৩০০ ফুট উচ্চতা হারানোর ঘটনা, নিরাপদ অবতরণ এবং কেন মৌসুমি আকাশপথে টার্বুলেন্সের ঝুঁকি বেশি—তার ব্যাখ্যা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















