রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা একটি ছোট্ট বিড়ালছানা আজ হাজারো মানুষের অনুপ্রেরণার নাম। কোমরের নিচের অংশে গুরুতর মেরুদণ্ডের আঘাত নিয়ে হাঁটতেও না পারা সেই বিড়ালছানা জেলাটো এখন খেলনা গাড়ির চাকা দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট হুইলচেয়ারের সাহায্যে দিব্যি চলাফেরা করছে। তার এই লড়াই ও ফিরে দাঁড়ানোর গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
রাস্তার ধারে অসহায় অবস্থায় উদ্ধার
এক রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে একটি রাস্তার পাশে বিড়ালের খাবারের হলুদ ব্যাগ দেখতে পান সেয়ার মরগান। কৌতূহলবশত গাড়ি থামিয়ে তিনি দেখেন, সেখানে কয়েকটি বিড়ালছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে একটি অন্যদের মতো দৌড়াতে পারছিল না। সেটি পাশ ফিরে পড়ে ছিল এবং দাঁড়ানো বা হাঁটার শক্তিই ছিল না।
মরগান পাঁচটি বিড়ালছানাকেই একটি প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, সবচেয়ে দুর্বল বিড়ালছানাটির কোমরের নিচের অংশে মেরুদণ্ডে আঘাত লেগেছে। সে হাঁটার চেষ্টা করলে পেছনের দুই পা মাটিতে টেনে নিয়ে এগোত।
খেলতে চাইত, কিন্তু হাঁটতে পারত না
আশ্রয়কেন্দ্রের ভেটেরিনারি সহকারী ম্যালোরি স্মিথ জানান, জেলাটো অন্য বিড়ালদের সঙ্গে খেলতে এবং পালকের খেলনা কিংবা বল নিয়ে সময় কাটাতে খুবই আগ্রহী ছিল। কিন্তু ওজন ছিল মাত্র এক পাউন্ডের কিছু বেশি এবং উচ্চতা ছিল প্রায় চার ইঞ্চি। এত ছোট হওয়ায় বাজারে পাওয়া কোনো প্রাণীর হুইলচেয়ার তার জন্য উপযুক্ত ছিল না।
জেলাটোকে নিজের বাড়িতে লালন-পালন করছিলেন স্মিথ। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যেভাবেই হোক বিড়ালছানাটিকে আবার চলাফেরার সুযোগ করে দিতে হবে।
![]()
খেলনা গাড়ি আর কাঠের স্কেল দিয়ে তৈরি হুইলচেয়ার
প্রথমে একটি কার্ডবোর্ডের বাক্স কেটে হুইলচেয়ারের কাঠামো তৈরি করেন স্মিথ। এরপর এক বন্ধুর কাছে থাকা পুরোনো খেলনা গাড়ির মধ্যে দুটি ছোট অ্যাম্বুলেন্স গাড়ির চাকা ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রথম পরীক্ষাতেই কার্ডবোর্ড ভেঙে পড়ে।
হাল না ছেড়ে তিনি অল্প দামে চারটি কাঠের স্কেল কিনে কার্ডবোর্ডের বদলে সেগুলো দিয়ে শক্ত ফ্রেম তৈরি করেন। বৈদ্যুতিক টেপ, ডাক্ট টেপ এবং প্লাস্টিকের বন্ধনী ব্যবহার করে সবকিছু জোড়া লাগানো হয়। পেছনের দিকে একটি সমর্থন বার জেলাটোর কোমর ধরে রাখে এবং একটি ছোট লাল বেল্ট তাকে নিরাপদে আটকে রাখে।
এই নতুন নকশা সফল হয়। প্রথমবারের মতো জেলাটো নিজের শক্তিতে সামনে এগোতে শুরু করে।
‘সিংহাসন’ নামের হুইলচেয়ারে আত্মবিশ্বাসী জেলাটো
স্মিথ ভালোবেসে এই হুইলচেয়ারের নাম দিয়েছেন ‘সিংহাসন’।
শুরুর দিকে জেলাটো কিছুটা ভয় পেলেও এখন সে বাড়ির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়, খেলনা নিয়ে খেলে এবং স্মিথের অন্য তিনটি বিড়ালের সঙ্গে দুষ্টুমি করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সে হুইলচেয়ারে দাঁড়িয়ে শারীরিক ব্যায়ামও করে। সেই ব্যায়ামের মাধ্যমে তার পায়ের পেশি ও চলাচলের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
ইতোমধ্যেই তার অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এখন সে হুইলচেয়ারের সাহায্য ছাড়াও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
নতুন প্রযুক্তিতে আরও উন্নত হুইলচেয়ার
জেলাটোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর হাজার হাজার মানুষ সেটি শেয়ার করেন। অনেকেই আরও উন্নত হুইলচেয়ার তৈরির প্রস্তাব দেন।
এরপর এক প্রকৌশলীর সহায়তায় জেলাটোর জন্য ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তিতে একটি নতুন হুইলচেয়ার তৈরি করা হয়েছে, যা তার শরীরের সঙ্গে মিলিয়ে বড় করা যাবে। কয়েক দিন আগে জেলাটো সেটি ব্যবহারও শুরু করেছে।
সামনে দত্তকের অপেক্ষা
ভেটেরিনারি দলের আশা, জেলাটোর পায়ে অনুভূতি থাকার কারণে ভবিষ্যতে সে হয়তো সম্পূর্ণ নিজের শক্তিতেই হাঁটতে পারবে। তবে তার আগে তাকে আরও কিছুদিন শারীরিক পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে নতুন পরিবারের কাছে দত্তক দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হবে। ইতোমধ্যে জেলাটোর গল্প ছড়িয়ে পড়ায় তাকে দত্তক নিতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে।
মাত্র কয়েক মাসের ছোট্ট জীবনে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেলেও জেলাটো আজ প্রমাণ করেছে—সঠিক যত্ন, ভালোবাসা আর একটু সৃজনশীল উদ্যোগ থাকলে অসম্ভব বলেও কিছু থাকে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















