বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রামের চারটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গত এক বছরে চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় তিন হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের প্রায় ৫৩ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। অনেকেই আগে জানতেন না যে তারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অন্য রোগের চিকিৎসা বা জটিলতা দেখা দেওয়ার পর তাদের রোগ শনাক্ত হচ্ছে।
বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এই তথ্য চিকিৎসকদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা, মানসিক চাপ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার মতো জীবনযাপনের পরিবর্তন তরুণদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অতিরিক্ত লবণই বড় ঝুঁকি
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল এবং পার্কভিউ হাসপাতালের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক রোগী দৈনিক ৭ থেকে ৯ গ্রাম পর্যন্ত লবণ গ্রহণ করছেন। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম লবণ গ্রহণের পরামর্শ দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু খাবারের সঙ্গে আলাদা লবণ নয়, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমেও অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে ফাস্টফুডে অভ্যস্ততা ও অনিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, কম দামের কারণে অনেক মানুষ এখনও খোলা লবণ ব্যবহার করেন, যেখানে আয়োডিনের ঘাটতি থাকে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
অনিয়মিত ঘুম ও স্ক্রিন টাইমের প্রভাব
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মো. নূর-আ-আলম খান জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম না হলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে ক্ষুধা বাড়ে, ওজন বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বর্তমানে বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারে মেলাটোনিন হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হয়, যা ঘুমের সমস্যা তৈরি করে। এর প্রভাব তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।
লক্ষণ ছাড়াই বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর সাধারণত দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে অধিকাংশ রোগী বুঝতেই পারেন না যে তারা আক্রান্ত। পরে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি জটিলতা বা হৃদরোগের মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি ধরা পড়ে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচএম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ১৮ বছর বয়সের পর অন্তত ছয় মাস পরপর রক্তচাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক তরুণ জীবনে একবারও রক্তচাপ মাপেননি।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, খাবারে লবণ কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তচাপ পরীক্ষা করলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। অতিরিক্ত লবণ, অনিয়মিত ঘুম ও স্ক্রিন টাইমকে দায়ী করছেন চিকিৎসকেরা। জেনে নিন কেন বাড়ছে ঝুঁকি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















