কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে চাকরির বাজারে এর প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরাও এখন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। অনেকের আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরে এআই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাজ কেড়ে নিতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ এখনো মনে করেন, ইতিহাস বলছে প্রযুক্তি যতই শক্তিশালী হোক, চাকরির বাজার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বহু মানুষ মনে করছেন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তারা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এআই। অনেক কর্মী বিশ্বাস করেন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও এআই তাদের বর্তমান কাজের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তি নেতাদের সতর্কবার্তা
এআই শিল্পের বড় বড় নেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। কেউ কেউ ভবিষ্যতে ব্যাপক বেকারত্বের আশঙ্কাও করছেন। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মানুষের কাজ পুরোপুরি বদলে দেওয়ার বদলে “সহযোগী প্রযুক্তি” হিসেবে এআইকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

অর্থনীতিবিদদের ভিন্ন মত
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই আতঙ্ককে অতিরঞ্জিত বলে মনে করছেন। তাদের যুক্তি, ইতিহাসে নতুন প্রযুক্তি সবসময় কিছু কাজ কমিয়েছে, আবার নতুন ধরনের কাজও তৈরি করেছে। শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু করে কম্পিউটার যুগ—প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময় একই ধরনের ভয় দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।
বর্তমান শ্রমবাজারও এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। উন্নত দেশগুলোর অনেক জায়গায় কর্মসংস্থানের হার রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। এমনকি আইন বা তথ্যভিত্তিক পেশার মতো এআই-ঝুঁকিপূর্ণ খাতেও এখনো ব্যাপক চাকরি হারানোর চিত্র দেখা যায়নি।
ইতিহাস কী বলছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির বিস্তার সাধারণত ধীরে ঘটে। কৃষিখাতে ট্রাক্টর ব্যবহারের উদাহরণই ধরা যেতে পারে। আধুনিক ট্রাক্টর আবিষ্কারের পরও কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমতে বহু দশক লেগেছে। একইভাবে শিল্প বিপ্লবের সময়ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন রাতারাতি লাখো মানুষকে বেকার করেনি। বরং নতুন শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে কর্মসংস্থান বেড়েছিল।

ঊনবিংশ শতকের ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের সময় শ্রমিক অসন্তোষ, যন্ত্র ভাঙচুর ও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছিল। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, শুধু যন্ত্র নয়, সেই সময় খাদ্যের উচ্চমূল্য, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যার পুরো দায় প্রযুক্তির ওপর চাপানো ঠিক নয়।
এআই কি আলাদা কিছু?
তবুও বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই ভিন্নভাবে দেখছেন। কারণ এআই শুধু শারীরিক শ্রম নয়, সৃজনশীল ও বুদ্ধিভিত্তিক কাজেও দ্রুত প্রবেশ করছে। লেখালেখি, প্রোগ্রামিং, ডিজাইন, গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে আইনি বিশ্লেষণ পর্যন্ত নানা খাতে এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। ফলে এই পরিবর্তনের গতি আগের যেকোনো প্রযুক্তিগত বিপ্লবের চেয়ে দ্রুত হতে পারে বলেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর প্রভাব কতটা ইতিবাচক হবে, তা নির্ভর করবে নীতি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতির ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















