দীর্ঘদিন ধরে “নিয়ানডারথাল” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বর্বর ও অদক্ষ মানুষের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। এবার রাশিয়ার সাইবেরিয়ার একটি গুহা থেকে পাওয়া ৫৯ হাজার বছরের পুরোনো দাঁত জানাচ্ছে, নিয়ানডারথালরা শুধু বেঁচে থাকার লড়াইই করত না, তারা দাঁতের চিকিৎসাও জানত।
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আধুনিক মানুষের বহু হাজার বছর আগেই নিয়ানডারথালরা দাঁতের সংক্রমণ দূর করতে দাঁতে ছিদ্র করত। গবেষকদের মতে, এটি মানব ইতিহাসে সবচেয়ে পুরোনো দাঁতের চিকিৎসার প্রমাণগুলোর একটি।
আলতাই পর্বতের গুহায় মিলল প্রমাণ
রাশিয়ার আলতাই পর্বতমালার চাগিরস্কায়া গুহা থেকে ২০১৬ সালে একটি পুরোনো দাঁত উদ্ধার করা হয়। এটি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নিয়ানডারথালের দাঁত বলে ধারণা করা হচ্ছে। দাঁতটি বহু বছর শক্ত ও খসখসে খাবার চিবানোর কারণে ক্ষয়ে গিয়েছিল।
গবেষকরা প্রথমে ভেবেছিলেন, দাঁতের মাঝখানের বড় গর্তটি স্বাভাবিক সংক্রমণের ফল। কিন্তু পরে অণুবীক্ষণ যন্ত্র ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে দেখা যায়, গর্তের ভেতরে ঘূর্ণায়মান ধারালো যন্ত্রের তৈরি সূক্ষ্ম দাগ রয়েছে।
সেখান থেকেই গবেষকদের সন্দেহ হয়, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দাঁতের ভেতরের সংক্রমিত অংশ সরানোর চেষ্টা করেছিল।
পাথরের যন্ত্র দিয়েই করা হয়েছিল চিকিৎসা
গবেষণায় দেখা যায়, ওই গুহায় আগে জ্যাসপার নামের এক ধরনের শক্ত পাথরের ছোট ধারালো যন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকরা একই ধরনের যন্ত্র তৈরি করে পরীক্ষামূলকভাবে দাঁতে ঘষে দেখেন।
তারা দেখতে পান, ঘূর্ণায়মানভাবে পাথরের যন্ত্র ব্যবহার করলে এক ঘণ্টারও কম সময়ে দাঁতে একই ধরনের দাগ তৈরি করা সম্ভব। সেই দাগের সঙ্গে প্রাচীন দাঁতের দাগের মিলও পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, এটিই প্রমাণ করে নিয়ানডারথালরা দাঁতের ভেতরের ক্ষত বা সংক্রমণ পরিষ্কার করার মতো জটিল কাজ করতে পারত।
চিকিৎসার পরও বেঁচে ছিল রোগী
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, দাঁতের গর্তের চারপাশে পরবর্তী সময়ে খাবার চিবানোর ক্ষয়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ চিকিৎসার পর ওই ব্যক্তি আরও দীর্ঘ সময় বেঁচে ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতেন।

দাঁতের পাশে আরও কিছু দাগ পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে নিয়ানডারথালরা দাঁতের ফাঁকে সরু কিছু ঢুকিয়ে মাড়ির অস্বস্তি কমানোর চেষ্টাও করত।
গবেষকদের মতে, এটি শুধু চিকিৎসা নয়, বরং ব্যথা সহ্য করে ভবিষ্যতের বড় বিপদ এড়ানোর মতো চিন্তাশক্তিরও প্রমাণ।
মানব ইতিহাস নিয়ে নতুন ভাবনা
এই আবিষ্কার নিয়ানডারথালদের নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে বড়ভাবে চ্যালেঞ্জ করছে। এতদিন মনে করা হতো, আধুনিক মানুষের মতো জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিল না। কিন্তু এই দাঁতের চিকিৎসার প্রমাণ বলছে, তারা কারণ–পরিণতি বুঝতে পারত এবং পরিকল্পনা করে কাজ করত।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনা দেখায় নিয়ানডারথালদের হাতের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ছিল এবং তারা চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও বুঝত।
মানব বিবর্তন নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে প্রাচীন মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক আচরণ আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















