দীর্ঘ এক দশক ধরে ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর উৎপাদনশীলতার সংকটে ভুগছিল বিশ্বের উন্নত দেশগুলো। বিশেষ করে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্রেও উৎপাদনশীলতার গতি ছিল হতাশাজনক। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে প্রায় দুই শতাংশ হারে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির উন্নয়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার উন্নতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভেতরে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
উৎপাদনশীলতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
একই পরিমাণ শ্রম ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন করতে পারাই উৎপাদনশীলতার মূল বিষয়। এটি বাড়লে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেশি আয় করে, কর্মীদের মজুরি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং পুরো অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।
দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা ছিল, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও উন্নত অর্থনীতিগুলো স্থবির হয়ে পড়ছে। তবে নতুন তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে
বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনও পুরোপুরি এই প্রবৃদ্ধির মূল চালক হয়ে ওঠেনি। কারণ বড় ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি বা আধুনিক এআই বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেছে খুব সাম্প্রতিক সময়ে। তবে এর আগেই উৎপাদনশীলতার উন্নতি শুরু হয়েছিল।
মূল পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারে। বিশেষ করে ক্লাউড কম্পিউটিং, স্মার্টফোন, ভিডিও কনফারেন্সিং ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের মাধ্যমে পেশাদার সেবা ও ব্যবস্থাপনা খাতে দক্ষতা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, দূরবর্তী কাজ সহজ হয়েছে এবং কম সময়ে বেশি কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
জ্বালানি খাতেও বড় পরিবর্তন

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। শেল গ্যাস বিপ্লবের ফলে দেশটি এখন বড় জ্বালানি রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে। নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্র নির্মাণের কারণে ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানি রপ্তানি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম দামের বিদ্যুৎ শিল্প খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করেছে। ফলে খনি, রাসায়নিক ও ভারী শিল্পের মতো খাতগুলো ইউরোপের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বেশি সক্রিয় রয়েছে।
মহামারির ধাক্কা থেকে নতুন সুযোগ
করোনা মহামারির সময় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নগদ সহায়তার পথ বেছে নিয়েছিল। এর ফলে কর্মীরা দ্রুত নতুন চাকরিতে যেতে পেরেছেন এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত কর্মী নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছে। এতে শ্রমবাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বড় শক্তি হলো এর নমনীয়তা। সংকটের সময়ও নতুন ব্যবসা ও নতুন প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণের ক্ষমতা দেশটির অর্থনীতিকে অন্য উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে রাখছে।
এআই যুগের অপেক্ষা
বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পূর্ণ প্রভাব এখনও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়নি। তবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ এবং তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেকেই এখন এটিকে নতুন এক “উৎপাদনশীলতার যুগ” হিসেবে দেখছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















