কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নতুন এক অর্থনৈতিক আশঙ্কাও। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এআই দ্রুত উন্নত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আর সেটি হলে শুধু শ্রমিকরাই নয়, বিপাকে পড়বে সরকারগুলোর অর্থনীতিও। কারণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনো মূলত শ্রম ও ভোগের ওপর কর আদায় করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
দীর্ঘদিন ধরে উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষের আয় থেকে কর নিয়ে সেই অর্থ সামাজিক সেবা, ভর্তুকি ও কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হয়। কিন্তু এআই যদি বিপুলসংখ্যক কাজ মানুষের বদলে মেশিনের হাতে তুলে দেয়, তাহলে সেই করভিত্তিক ব্যবস্থাই বড় ধাক্কা খেতে পারে।
শ্রম আয়ের অংশ কমে যাওয়ার শঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, আধুনিক ইতিহাসে শ্রম ও মূলধনের আয়ের অনুপাত দীর্ঘদিন প্রায় একই ছিল। সাধারণভাবে শ্রম থেকে আসা আয় মোট আয়ের বড় অংশ জুড়ে থাকত। কিন্তু এআই প্রযুক্তি যদি উৎপাদন ও ব্যবসার বড় অংশ দখল করে নেয়, তাহলে আয়ের বড় অংশ চলে যেতে পারে প্রযুক্তি কোম্পানি ও মূলধনের মালিকদের হাতে। এতে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন হবে—কল্যাণমূলক ব্যয় চালানো হবে কীভাবে? কারণ বেকারত্ব বাড়লে সরকারকে আরও বেশি সামাজিক সহায়তা দিতে হবে। অথচ কর আদায়ের প্রধান উৎসই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
করব্যবস্থায় আসতে পারে বড় পরিবর্তন
বিশ্বের ধনী দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে মোট কর আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে শ্রম থেকে। আরেকটি বড় অংশ আসে ভোগ কর থেকে। কিন্তু ভবিষ্যতে সরকারগুলো হয়তো ভোগ কর আরও বাড়ানোর পথে যেতে পারে। কারণ ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবা কিনবেন, ফলে সেই খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের সুযোগ থাকবে।

একইসঙ্গে মূলধন বা পুঁজির ওপর কর বাড়ানোর আলোচনা জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি এআই থেকে বিপুল মুনাফা করবে, তাদের ওপর বেশি কর আরোপের চিন্তা করছেন নীতিনির্ধারকেরা। তবে অর্থনীতিবিদদের অনেকে সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত কর বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন কমিয়ে দিতে পারে।
রোবট কর থেকে শেয়ার মালিকানা
এআই যুগে নতুন ধরনের করের ধারণাও সামনে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘রোবট কর’ বা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর কর। আবার এআই ব্যবহারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে আলাদা কর আরোপের কথাও আলোচনা হচ্ছে। যদিও সমালোচকেরা বলছেন, এসব কর প্রযুক্তিগত উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
আরেকটি বড় ধারণা হলো সাধারণ মানুষকে এআই কোম্পানির মালিকানায় অংশীদার করা। অর্থাৎ শুধু কর আদায় নয়, বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা বিনিয়োগের মাধ্যমে জনগণকে সরাসরি মুনাফার অংশ দেওয়া। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষোভও কমবে।
এআই কোম্পানির শেয়ারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
![]()
বর্তমানে বিশ্বের অনেক সাধারণ মানুষ অবসরভাতা বা সঞ্চয় তহবিলের মাধ্যমে বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগকারীরা পরোক্ষভাবে এনভিডিয়া, অ্যালফাবেট বা অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে থাকেন। ভবিষ্যতে এআইভিত্তিক কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে এলে সেই সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার চাইলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিনিয়োগ ও শেয়ার মালিকানার সুযোগ বাড়িয়ে বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করতে পারে। এতে এআই থেকে তৈরি হওয়া সম্পদের একটি অংশ সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে।
অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা
এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ থাকলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের হাতে এখনো নানা উপায় রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকারগুলো কি সত্যিই নতুন বাস্তবতায় কর ও সম্পদ বণ্টনের কাঠামো বদলাতে সাহসী পদক্ষেপ নেবে, নাকি পুরোনো ব্যবস্থাই আঁকড়ে থাকবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















